হোম / টেক / যন্ত্রের জাগরণ

যন্ত্রের জাগরণ

একশো ছাব্বিশ বছর আগে এক জার্মান পদার্থবিদের ভয় পাওয়া রাত থেকে শুরু। কোয়ান্টাম মেকানিক্স, টুরিং আর কম্পিউটারের জন্ম, দুইটা AI শীতকাল, ট্রান্সফরমার আর ChatGPT, আর কোয়ান্টাম কম্পিউটিং; তিনটা আলাদা ইতিহাস কীভাবে একই মোহনায় এসে মিশছে, তার ২০ পর্বের গল্প।

যন্ত্রের জাগরণ — কভার আর্ট, কুয়াশাচ্ছন্ন শহরের ধ্বংসস্তূপে জেগে ওঠা এক বিশাল যান্ত্রিক অবয়ব

জাফরান হাসান

একটা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি। কোয়ান্টাম ফিজিক্স, কম্পিউটার, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, আর কোয়ান্টাম কম্পিউটিং; এই চারটা জিনিস কি একে অপরের সাথে সম্পর্কিত? উত্তর হ্যাঁ, এবং সম্পর্কটা এতটাই গভীর যে সেটা বুঝলে আজকের পৃথিবীটা অন্যভাবে দেখা শুরু করবেন।

এটা এক শতাব্দী ধরে বয়ে চলা তিনটা নদীর গল্প। ১৯০০ সালে বার্লিনের এক শীতের রাতে যার শুরু, আজ যার মোহনা আপনার হাতের ফোনে, আপনার শহরের ডেটা সেন্টারে, আর পরের দশকের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তে।

২০টা পর্ব, একটানা এক পাতায়। বাঁ পাশের তালিকা থেকে সরাসরি যেকোনো পর্বে লাফ দিতে পারেন।

সব পর্ব

    পর্ব ১: যে রাতে পুরনো পৃথিবী মারা গেল

    পর্ব ১: যে রাতে পুরনো পৃথিবী মারা গেল
    ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক। ছবি সৌজন্যে Smithsonian Institution Libraries, পাবলিক ডোমেইন — Wikimedia Commons

    ১৯০০ সালের ডিসেম্বর। বার্লিন। রাত অনেক।

    ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক নিজের ছেলেকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছেন। ঠান্ডায় নিঃশ্বাস ধোঁয়া হয়ে উড়ছে। হঠাৎ উনি থামলেন। ছেলের কাঁধে হাত রেখে নিচু গলায় বললেন,

    “আমি সম্ভবত এমন একটা আবিষ্কার করে ফেলেছি, যেটা নিউটনের আবিষ্কারের সমান বড়।”

    ছেলে হেসে ফেলেছিল কি না জানা যায় না। কিন্তু প্ল্যাঙ্ক হাসছিলেন না।

    উনি ভয় পাচ্ছিলেন।

    সমস্যাটা খুলে বলি। কামারের দোকানে দেখবেন, লোহা গরম করলে প্রথমে লাল হয়, তারপর কমলা, তারপর প্রায় সাদা। এই সহজ জিনিসটার হিসাব তখনকার ফিজিক্সের সব ফর্মুলায় ফেল মারছিল। ফর্মুলা অনুযায়ী গরম চুলার সামনে দাঁড়ালে আপনার গায়ে অসীম এনার্জি এসে পড়ার কথা।

    মানে মায়ের রান্নাঘরে ঢুকলেই ভস্ম।

    অথচ আপনি বেঁচে আছেন। তাহলে ভুলটা কোথায়?

    প্ল্যাঙ্ক মাসের পর মাস লড়লেন। শেষে মরিয়া হয়ে একটা “চিটিং” করলেন। ধরে নিলেন, এনার্জি পানির মত একটানা স্রোতে আসে না।

    এনার্জি আসে চিনির দানার মত। আলাদা আলাদা প্যাকেটে।

    নাম দিলেন কোয়ান্টাম।

    আর ম্যাজিকের মত সব হিসাব মিলে গেল।

    মজার ব্যাপার কী জানেন? প্ল্যাঙ্ক নিজেই বিশ্বাস করতেন না। ভাবতেন এটা স্রেফ অঙ্কের কারসাজি, প্রকৃতি আসলে এমন পাগল না। উনি চেয়েছিলেন কেউ একদিন এই “ভুল” শুধরে দিক।

    কেউ শুধরালো না।

    বরং পঁচিশ বছরের মধ্যে বেরিয়ে এলো আরো ভয়ংকর সত্য। এই কোয়ান্টাম জগতে একটা কণা একসাথে দুই জায়গায় থাকতে পারে। আপনি না তাকালে সে এক রকম, তাকালেই আরেক রকম।

    শুনতে জ্বীন-ভূতের গল্প লাগছে?

    পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষটারও তাই মনে হয়েছিল। এবং তিনি ঠিক করলেন, এই ভূত তিনি নিজ হাতে তাড়াবেন।

    তার নাম আলবার্ট আইনস্টাইন।

    আর এই গল্পের সবচেয়ে বড় টুইস্ট হলো, আইনস্টাইন যে ভূতটাকে তাড়াতে চেয়েছিলেন, একশো বছর পরে সেই ভূতটাই হয়ে উঠবে ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী মেশিনের প্রাণভোমরা।

    কিন্তু সে অনেক পরের কথা।

    আগে সেই নাস্তার টেবিলের যুদ্ধটা দেখে আসি।

    পর্ব ২: নাস্তার টেবিলে ঈশ্বর

    পর্ব ২: নাস্তার টেবিলে ঈশ্বর
    ১৯২৭ সালের সলভে কনফারেন্স, ব্রাসেলস। এই দলীয় ছবিতে আইনস্টাইন আর বোর দুজনেই আছেন। ছবি: Benjamin Couprie, পাবলিক ডোমেইন — Wikimedia Commons

    ১৯২৭ সাল। ব্রাসেলসের হোটেল মেট্রোপোল। সকাল।

    “হের বোর।” আইনস্টাইন কফির কাপ নামিয়ে রাখলেন। চোখে দুষ্টু ঝিলিক। “কাল রাতে আমি আপনার কোয়ান্টাম থিওরিটা খুন করার একটা উপায় বের করেছি।”

    নিলস বোর মুখ তুললেন। ক্লান্ত হাসি। “আবার?”

    “আবার।”

    সলভে কনফারেন্স চলছে। এক ছাদের নিচে পৃথিবীর সেরা ২৯টা মস্তিষ্ক, যাদের ১৭ জন নোবেল পাবেন। আর সবার চোখ এই দুইজনের ডুয়েলে।

    ঝগড়ার বিষয়টা সহজ ভাষায় বলি। নতুন কোয়ান্টাম মেকানিক্স বলছিল, একটা ইলেকট্রন কোথায় আছে তা মাপার আগে নিশ্চিত বলা যায় না। শুধু সম্ভাবনা বলা যায়। মানে প্রকৃতি নিজেই লুডু খেলছে।

    ভাবেন, লুকোচুরি খেলছেন, কিন্তু আপনার বন্ধু একইসাথে খাটের নিচে আর ছাদে। আপনি খুঁজতে গেলেই সে “সিদ্ধান্ত নেয়” কোথায় ধরা দেবে।

    আইনস্টাইনের কাছে এটা ছিল অপমান। বিজ্ঞানের কাজ নিশ্চয়তা দেওয়া, জুয়া খেলা না। ওনার বিখ্যাত সেই কথা, “ঈশ্বর পাশা খেলেন না।”

    বোরের উত্তরটাও ইতিহাসে ঢুকে গেছে। “ঈশ্বরকে কী করতে হবে, সেটা বলে দেওয়া বন্ধ করুন।”

    তারপর যেটা চললো, সেটাকে বলা যায় বিজ্ঞানের সবচেয়ে ভদ্র মারামারি। প্রতিদিন সকালে আইনস্টাইন নাস্তার টেবিলে নতুন একটা থট এক্সপেরিমেন্ট আনতেন। বোর সারাদিন পায়চারি করতেন, বিড়বিড় করতেন, আর রাতের খাবারের সময় উত্তর দিতেন।

    প্রতিদিন আক্রমণ। প্রতিদিন প্রতিরোধ।

    দিনের শেষে স্কোরবোর্ড? আইনস্টাইন শূন্য।

    কিন্তু হার মানার পাত্র তিনি না। আট বছর পরে ছুড়লেন শেষ ব্রহ্মাস্ত্র। বললেন, তোমাদের থিওরি মানলে দাঁড়ায়, দুইটা কণা একবার জোড়া লাগলে তারা চিরকাল জোড়া থাকে। একটাকে ছুঁলে আরেকটা সাথে সাথে বদলে যাবে। একটা ঢাকায় আরেকটা চাঁদে থাকলেও। সাথে সাথে।

    আলোর চেয়েও দ্রুত।

    উনি ব্যঙ্গ করে নাম দিলেন, “ভুতুড়ে কাণ্ড।” Spooky action at a distance। যুক্তিটা ছিল, এমন হাস্যকর ফলাফল যে থিওরি থেকে বের হয়, সেই থিওরি নিশ্চয়ই অসম্পূর্ণ।

    কয়েক দশক পরে ল্যাবে পরীক্ষা হলো।

    ভুতুড়ে কাণ্ডটা সত্যি।

    কণারা সত্যিই এভাবে জোড়া লাগে। বিজ্ঞানীরা নাম দিলেন quantum entanglement।

    এই শব্দটা মাথায় গেঁথে রাখেন। এই ভূত এই গল্পে আরো দুইবার ফিরবে। শেষবার যখন ফিরবে, তখন তার হাতে থাকবে এমন ক্ষমতা যা আইনস্টাইন দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করেননি।

    আপাতত ইউরোপের আকাশে অন্য অন্ধকার নামছে। যুদ্ধ আসছে।

    আর সেই যুদ্ধের ভেতর থেকেই জন্ম নেবে আমাদের গল্পের দ্বিতীয় নদী।

    পর্ব ৩: যে ছেলেটা মেশিনের স্বপ্ন দেখতো

    পর্ব ৩: যে ছেলেটা মেশিনের স্বপ্ন দেখতো
    অ্যালান টুরিং, ১৯৫১। ছবি: Elliott & Fry, Computer History Museum, পাবলিক ডোমেইন — Wikimedia Commons

    গল্পটা শুরু করি একটা মৃত্যু দিয়ে।

    ১৯৩০ সাল। ইংল্যান্ড। আঠারো বছরের এক কিশোর তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুকে হারালো। ক্রিস্টোফার মরকম। যক্ষ্মায়।

    দুজনে একসাথে বিজ্ঞানের স্বপ্ন দেখতো। তারা, গ্রহ, অঙ্ক। ক্রিস্টোফার মারা যাওয়ার পর ছেলেটা তার মাকে চিঠি লিখলো। চিঠির সারমর্ম ছিল একটা প্রশ্ন।

    মানুষ মরে গেলে তার মনটা কোথায় যায়? মন কি শুধুই শরীরের যন্ত্রপাতির খেলা? তাহলে সেই খেলাটা কি অন্য কোনো যন্ত্রে চালানো সম্ভব?

    ছেলেটার নাম অ্যালান টুরিং।

    বন্ধু হারানোর শোক থেকে জন্ম নেওয়া সেই প্রশ্নটাই একদিন পাল্টে দেবে মানব সভ্যতা। ভাবা যায়?

    ১৯৩৬ সালে, মাত্র ২৪ বছর বয়সে, টুরিং একটা পেপার লিখলেন। কাগজে-কলমে ডিজাইন করলেন এক কাল্পনিক মেশিন। এমন মেশিন, যাকে ঠিকঠাক নির্দেশনা দিলে সে যেকোনো হিসাব করতে পারবে। যেকোনো।

    আজ আপনার হাতের ফোন, অফিসের ল্যাপটপ, নাসার সুপারকম্পিউটার। সব ওই খাতার মেশিনের বংশধর। একটা শোকার্ত তরুণের খাতার পাতা থেকে জন্ম নিয়েছে আপনার পকেটের জগৎটা।

    তারপর এলো যুদ্ধ। আর যুদ্ধ টুরিংকে টেনে নিয়ে গেল এক গোপন জায়গায়।

    ব্লেচলি পার্ক।

    সেখানে কী হয়েছিল, সেটা নিজেই একটা থ্রিলার। পরের পর্বে।

    শুধু একটা দৃশ্য দিয়ে শেষ করি। ব্লেচলিতে টুরিংকে সবাই অদ্ভুত বলে জানতো। নখ কামড়াতেন। জুন মাসে গ্যাস মাস্ক পরে সাইকেল চালাতেন, কারণ ওনার হে ফিভার ছিল। নিজের চায়ের মগ চেইন দিয়ে রেডিয়েটরের সাথে তালা মেরে রাখতেন, পাছে কেউ নিয়ে যায়।

    সহকর্মীরা হাসাহাসি করতো।

    তারা জানতো না, এই “পাগল” লোকটার মাথার ভেতরে দুইটা জিনিস একসাথে চলছে।

    এক, হিটলারের অজেয় কোড ভাঙার নকশা।

    দুই, সেই পুরনো প্রশ্নটা। মন কি যন্ত্রে চালানো যায়?

    পর্ব ৪: ১৫ কোটি কোটি কোটি

    পর্ব ৪: ১৫ কোটি কোটি কোটি
    ব্লেচলি পার্ক মিউজিয়ামে রাখা “বোম্ব” মেশিনের একটা রেপ্লিকা। ছবি: Sarah Hartwell, CC BY-SA — Wikimedia Commons

    প্রতিদিন রাতে আটলান্টিকে মানুষ ডুবে মরছিল।

    ১৯৪০-৪১ সাল। জার্মান ইউ-বোট সাবমেরিনগুলো ভূতের মত এসে ব্রিটেনের খাবার আর অস্ত্রের জাহাজ ডুবিয়ে দিচ্ছিল। ব্রিটেন একটা দ্বীপ। জাহাজ বন্ধ মানে না খেয়ে মরা।

    সাবমেরিনগুলোর সব মেসেজ এনক্রিপ্ট হতো একটা মেশিনে। এনিগমা। দেখতে টাইপরাইটারের মত, কাজে শয়তানের মত। প্রতিদিন রাত বারোটায় সেটিং বদলায়। সম্ভাব্য সেটিং কয়টা?

    ১৫ কোটি কোটি কোটির বেশি।

    জার্মানরা জানতো এটা অভাঙা। গণিতের হিসাবেই অভাঙা। এক হাজার মানুষ দিনরাত হিসাব করলেও একটা দিনের সেটিং ভাঙতে লাগবে হাজার হাজার বছর। আর পরদিন রাত বারোটায় সব আবার শূন্য থেকে শুরু।

    ব্লেচলি পার্কের হাটগুলোতে তখন হতাশা। একজন সিনিয়র অফিসার নাকি বলেছিলেন, “আমরা অসম্ভবের সাথে যুদ্ধ করছি।”

    টুরিং ভিন্নভাবে ভাবলেন।

    ওনার যুক্তিটা ছিল ভয়ংকর সহজ। মেশিনের গতির সাথে মানুষ পারবে না।

    মেশিনের বিরুদ্ধে লাগবে মেশিন।

    উনি আর ওনার টিম বানালেন “বোম্ব”। বিশাল এক ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল দানব, ভেতরে সারি সারি ঘূর্ণন ড্রাম, যেটা মানুষের চেয়ে হাজার গুণ দ্রুত সম্ভাবনা বাতিল করতে পারতো। ঘরভর্তি টিকটিক টিকটিক শব্দ। সেই শব্দের মধ্যে দাঁড়িয়ে অপারেটর মেয়েরা অপেক্ষা করতো কখন মেশিন থামবে।

    মেশিন থামা মানে সেটিং পাওয়া গেছে।

    সেটিং পাওয়া মানে সেদিনের সব জার্মান মেসেজ পড়া যাবে। কোন সাবমেরিন কোথায় ওঁত পেতে আছে, সব।

    ইতিহাসবিদদের হিসাবে ব্লেচলির এই কাজ যুদ্ধ অন্তত দুই বছর ছোট করেছে। বাঁচিয়েছে আনুমানিক লাখ লাখ প্রাণ।

    আর পুরোটাই ছিল টপ সিক্রেট। যুদ্ধ শেষে সবাইকে কসম খাওয়ানো হলো, কেউ কিছু বলবে না। যে মানুষগুলো লাখো প্রাণ বাঁচালো, তারা দশকের পর দশক কাউকে বলতেই পারলো না তারা যুদ্ধে কী করেছে। মা-বাবাও জানলো না।

    কিন্তু টুরিংয়ের জন্য যুদ্ধটা ছিল শুধু ওয়ার্ম-আপ।

    ১৯৫০ সালে উনি একটা পেপার ছাপলেন, যার শুরুটা পড়লে আজও গায়ে কাঁটা দেয়।

    “আমি একটা প্রশ্ন বিবেচনার প্রস্তাব করছি। মেশিন কি চিন্তা করতে পারে?”

    আর সেই প্রশ্নের উত্তর মাপার জন্য দিলেন একটা টেস্ট। পর্দার আড়ালে কারো সাথে চ্যাট করেন। যদি বুঝতে না পারেন ওপাশে মানুষ না মেশিন, তাহলে মানতে হবে, মেশিনটা চিন্তা করছে।

    লাইনটা আরেকবার পড়েন। পর্দার আড়ালে চ্যাট। ওপাশে কে, বোঝা যাচ্ছে না।

    ২০২৬ সালে বসে চেনা চেনা লাগছে না?

    কিন্তু কম্পিউটার আর কোড ভাঙাই টুরিংয়ের একমাত্র অবদান না। যুদ্ধের পরে তিনি এমন একটা আইডিয়া লিখে গেলেন, যেটা তার সময়ের সবার মাথার অনেক উপর দিয়ে গিয়েছিল, আর যেটার উপর সত্তর বছর পরে দাঁড়াবে গোটা AI বিপ্লব।

    পর্ব ৫: শিশুর মন

    যুদ্ধ শেষ। টুরিং ফিরলেন গবেষণায়।

    ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন পৃথিবীর প্রথম দিকের সত্যিকারের কম্পিউটারগুলোর একটা বানানোর কাজ চলছে, আর তার একেবারে কেন্দ্রে টুরিং। কাগজে-কলমে যে মেশিন তিনি ১৯৩৬ সালে কল্পনা করেছিলেন, এবার সেটা ধাতু আর তারের শরীর পাচ্ছে তার চোখের সামনে।

    কিন্তু কম্পিউটার বানানোতেই তার মন আটকে ছিল না। মাথায় ঘুরছিল সেই পুরনো প্রশ্নটা। মেশিন কি চিন্তা করতে পারে?

    আর এই প্রশ্নের পিছু নিতে গিয়ে তিনি এমন একটা আইডিয়া লিখে গেলেন, যেটা তার সময়ের প্রায় সবার মাথার অনেক উপর দিয়ে গেছে।

    সবাই তখন ধরে নিয়েছিল, বুদ্ধিমান মেশিন বানানো মানে একজন পূর্ণবয়স্ক বিশেষজ্ঞের সব জ্ঞান, সব নিয়ম, ধরে ধরে মেশিনের ভেতরে বসিয়ে দেওয়া।

    টুরিং বললেন, উল্টো করে ভাবো।

    তিনি লিখলেন, বড় মানুষের মন হুবহু নকল করার চেষ্টা না করে বরং একটা শিশুর মনের মত একটা মেশিন বানানো সহজ হতে পারে। এমন একটা মেশিন, যেটা শুরুতে প্রায় খালি, কিন্তু শেখার ক্ষমতা রাখে। তারপর তাকে শেখাও, ঠিক যেভাবে একটা বাচ্চাকে শেখানো হয়। ভুল করবে, শুধরে দেবে, আবার শিখবে।

    এই একটা লাইন মনে রাখেন। সত্তর বছর পরে গোটা AI বিপ্লব দাঁড়াবে ঠিক এই আইডিয়ার উপর। মেশিনকে নিয়ম মুখস্থ করানো না, মেশিনকে শেখার ক্ষমতা দেওয়া। এই সিরিজের অনেকটা জুড়েই আমরা এই আইডিয়ায় ফিরে ফিরে আসবো।

    টুরিং শুধু মেশিনের কথাই ভাবতেন না। জীবনের শেষ দিকে তিনি একটা অদ্ভুত সুন্দর প্রশ্নেও ডুবে ছিলেন। বাঘের গায়ে ডোরা, চিতার গায়ে ছোপ, ফুলের পাপড়ির নকশা, এই প্যাটার্নগুলো প্রকৃতি বানায় কীভাবে? তিনি অঙ্ক কষে দেখালেন, সহজ কিছু রাসায়নিক নিয়ম থেকেই আপনাআপনি এত জটিল নকশা তৈরি হতে পারে। আজ যাকে বলে গাণিতিক জীববিজ্ঞান, তার একটা ভিত্তিও গেঁথে দিয়ে গেছেন এই একই মানুষ।

    একবার ভাবেন। কম্পিউটারের নকশা, কোড ভাঙার যুদ্ধ, মেশিন-বুদ্ধিমত্তার স্বপ্ন, আর প্রকৃতির নকশার অঙ্ক। একেকটা ক্ষেত্র, যার যেকোনো একটাই একজন মানুষের সারা জীবনের কাজ হতে পারতো। এই সবগুলো একটাই মাথা থেকে বেরিয়েছে।

    টুরিং অবশ্য বেশিদিন বাঁচেননি। ১৯৫৪ সালে, মাত্র ৪১ বছর বয়সে, তিনি চলে গেলেন। এই নদীর মোহনা শেষমেশ কোথায় গিয়ে মিশবে, সেটা দেখে যাওয়ার সময় তিনি পাননি।

    কিন্তু একটা জিনিস রয়ে গেল।

    প্রশ্নটা।

    “মেশিন কি চিন্তা করতে পারে?”

    প্রশ্নটা আটলান্টিক পার হয়ে আমেরিকায় পৌঁছে গেল। সেখানে তখন যুদ্ধোত্তর টাকার জোয়ার, নতুন নতুন ল্যাব, আর একদল ডানপিটে তরুণ বিজ্ঞানী।

    আর ছিল একেকটা দানব। ২৭ টনের দানব।

    পর্ব ৬: দানবের পেটে পোকা

    পর্ব ৬: দানবের পেটে পোকা
    ENIAC, ১৯৪৬। ছবি: মার্কিন সেনাবাহিনী, পাবলিক ডোমেইন — Wikimedia Commons

    এবার একটু হালকা গল্প বলি। হাসতেও তো হবে, নাকি?

    ১৯৪৬ সাল। পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটির বেজমেন্টে বসে আছে ENIAC। পৃথিবীর প্রথম জেনারেল পারপাস ইলেকট্রনিক কম্পিউটার। ওজন ২৭ টন। জায়গা লাগে একটা বড় ফ্ল্যাটের সমান। ভেতরে প্রায় ১৮ হাজার ভ্যাকুয়াম টিউব, মানে মোটামুটি বাল্ব টাইপের জিনিস।

    গুজব ছিল, এটা চালু করলে ফিলাডেলফিয়া শহরের বাতি টিমটিম করে। গুজবটা সম্ভবত বাড়াবাড়ি, কিন্তু বিদ্যুৎ যে রাক্ষসের মত খেতো, সেটা সত্যি। এই লাইনটা মনে রাখেন। যন্ত্রের বিদ্যুতের খিদে নিয়ে আমরা এই সিরিজের শেষ দিকে ভয়ংকর এক গল্পে ফিরবো।

    আর নখরা? বাপরে। টিউবগুলো বাল্বের মতই কথায় কথায় কেটে যেত। ইঞ্জিনিয়াররা টর্চ হাতে দানবের পেটে ঢুকে খুঁজতেন কোনটা মরলো।

    এর মধ্যে একদিন এক কম্পিউটারের লগবুকে টেকনিশিয়ানরা একটা মথ পোকা টেপ দিয়ে আটকে লিখে রাখলেন, “First actual case of bug being found.”

    কম্পিউটারের সমস্যাকে যে আজও আমরা “bug” বলি, তার পেছনের বিখ্যাত কাহিনিগুলোর একটা এই পোকা।

    যাই হোক। এই দানব সেকেন্ডে হাজার হাজার হিসাব করতো, আর মানুষ দেখে হা হয়ে যেত। পত্রিকা নাম দিলো “জায়ান্ট ব্রেইন।” কিন্তু সমস্যা হলো, এই ব্রেইন যেমন বিশাল, তেমন নাজুক, তেমন বিদ্যুতখেকো। এভাবে বেশি দূর যাওয়া যাবে না।

    দরকার ছিল একটা মিরাকল।

    মিরাকলটা এলো ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে, বেল ল্যাবস থেকে। তিন বিজ্ঞানী টেবিলে রাখলেন ছোট্ট, কুৎসিত দেখতে একটা জিনিস। রাস্তায় পড়ে থাকলে আপনি লাথি মেরে চলে যেতেন।

    ট্রানজিস্টর।

    প্রথম ট্রানজিস্টরের একটা রেপ্লিকা
    প্রথম ট্রানজিস্টরের একটা রেপ্লিকা, বেল ল্যাবস। পাবলিক ডোমেইন — Wikimedia Commons

    ভ্যাকুয়াম টিউবের সব কাজ পারে। কিন্তু ছোট, ঠান্ডা, প্রায় অমর, আর বিদ্যুৎ খায় পাখির মত।

    সবচেয়ে বড় কথা, এর মূল কাঁচামাল সিলিকন।

    সিলিকন মানে কী জানেন তো? বালির মূল উপাদান।

    মানুষ শিখে ফেললো বালিকে দিয়ে চিন্তা করানোর কৌশল।

    এই ছোট্ট কুৎসিত জিনিসটার জন্য ওই তিনজন নোবেল পেলেন। আর পৃথিবী পেলো এমন এক ইঞ্জিন, যেটা পরের সত্তর বছর সভ্যতাকে টেনে নিয়ে যাবে।

    কত জোরে টানবে?

    সেই হিসাবটা প্রথম করেছিলেন এক ভদ্রলোক, ১৯৬৫ সালে, একটা ম্যাগাজিনের আর্টিকেলে। হিসাবটা এতই অবিশ্বাস্য ছিল যে পরে সেটা “আইন” নাম পেয়ে গেল।

    মুরের ল।

    পর্ব ৭: দ্বিগুণের অভিশাপ

    একটা খেলা খেলি আসেন।

    একটা কাগজ নেন। ভাঁজ করেন। পুরুত্ব দ্বিগুণ হলো। আবার ভাঁজ। চারগুণ। এভাবে ৪২ বার ভাঁজ করতে পারলে কাগজের পুরুত্ব কত হবে বলেন তো?

    চাঁদ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে।

    বিশ্বাস হয় না, তাই না? দ্বিগুণের খেলা এমনই। শুরুতে হাঁটে, তারপর দৌড়ায়, তারপর উড়ে যায়।

    ১৯৬৫ সালে গর্ডন মুর খেয়াল করলেন, চিপে ট্রানজিস্টরের সংখ্যা মোটামুটি প্রতি দেড়-দুই বছরে দ্বিগুণ হচ্ছে। উনি ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, এটা চলতে থাকবে।

    লোকজন ভাবলো, বছর দশেক চলবে হয়তো।

    চললো পঞ্চাশ বছরের বেশি।

    ফলাফলটা সংখ্যায় বললে মাথা ঘোরে। প্রথম দিকের চিপে ট্রানজিস্টর ছিল হাতে গোনা। আজ আপনার ফোনের চিপে ট্রানজিস্টর শত শত কোটি। একেকটা এত ছোট যে ভাইরাসও তার পাশে দৈত্য।

    এই দ্বিগুণের জোয়ারে ভেসে এলো সব। মেইনফ্রেম, পার্সোনাল কম্পিউটার, ইন্টারনেট, স্মার্টফোন। সিয়াটল আর সিলিকন ভ্যালির গ্যারেজে বসা ছেলেপেলে হয়ে গেল পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ।

    আর জন্ম নিলো সুপারকম্পিউটার। দেশে দেশে প্রতিযোগিতা, কার মেশিন সবচেয়ে দ্রুত। আবহাওয়ার পূর্বাভাস, পারমাণবিক সিমুলেশন, মহাকাশ। সুপারকম্পিউটার হয়ে গেল জাতীয় অহংকারের বিষয়, অলিম্পিকের মেডেলের মত।

    সবাই ধরে নিলো, এই পার্টি চিরকাল চলবে।

    কিন্তু কিছু ফিজিসিস্ট চুপচাপ হিসাব কষে ঘামছিলেন।

    কারণটা বুঝিয়ে বলি। ট্রানজিস্টর ছোট হচ্ছে মানে ইলেকট্রনের চলার রাস্তা সরু হচ্ছে। রাস্তা সরু হতে হতে যখন কয়েকটা পরমাণুর সমান হয়ে যায়, তখন এক ভয়ংকর কাণ্ড শুরু হয়।

    ইলেকট্রন আর ভদ্র ছেলের মত রাস্তায় থাকে না।

    দেয়াল ভেদ করে ওপাশে চলে যায়। কোনো ফুটো ছাড়াই। ভূতের মত।

    এই জিনিসের নাম কোয়ান্টাম টানেলিং। আর এটা কোন জগতের নিয়ম, বলেন তো?

    ঠিক ধরেছেন। পর্ব ১ আর ২-এর সেই পাগলাটে কোয়ান্টাম জগৎ।

    মানে ব্যাপারটা দাঁড়ালো এই। কম্পিউটার যত শক্তিশালী হতে চায়, তত তাকে ছোট হতে হয়। আর যত ছোট হয়, তত সে ঢুকে পড়ে সেই ভুতুড়ে জগতে, যেখানে তার নিজের নিয়মকানুন আর কাজ করে না।

    ক্লাসিক্যাল কম্পিউটিং নিজের কবরের দিকে দৌড়াচ্ছিল। এবং যত জোরে সাফল্য, তত জোরে দৌড়।

    এটাই দ্বিগুণের অভিশাপ।

    কিন্তু দাঁড়ান। এই সংকটের গল্পে ঢোকার আগে আমাদের তৃতীয় নদীর জন্মটা দেখে আসতে হবে।

    চলেন ১৯৫৬ সালের এক রোদেলা গ্রীষ্মে। যেখানে একদল তরুণ বিশ্বাস করতো, মানুষের মত ভাবা মেশিন বানাতে লাগবে বড়জোর এক জেনারেশন।

    আহা, কী নিষ্পাপ ছিল তারা।

    পর্ব ৮: এক গ্রীষ্মের স্বপ্ন

    ১৯৫৬ সাল। আমেরিকার ডার্টমাথ কলেজ। গ্রীষ্মের ছুটি।

    ক্যাম্পাস ফাঁকা, শুধু একটা বিল্ডিংয়ে জনা দশেক তরুণ গবেষক। চক-ডাস্টারের গন্ধ, কফির কাপ, আর আকাশছোঁয়া আত্মবিশ্বাস।

    তাদের ফান্ডিং প্রপোজালে একটা লাইন ছিল, যেটা পড়লে আজ হাসি আর মায়া দুটোই লাগে। তারা লিখেছিল, মেশিন কীভাবে ভাষা ব্যবহার করবে, ধারণা বানাবে, নিজেকে উন্নত করবে, এসব সমস্যায় “উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি” সম্ভব, যদি বাছাই করা কয়েকজন বিজ্ঞানী এক গ্রীষ্ম একসাথে কাজ করেন।

    এক গ্রীষ্ম!

    এই ওয়ার্কশপেই জন সিদ্ধান্ত হলো নতুন ক্ষেত্রটার একটা নাম দরকার। জন ম্যাকার্থি নাম দিলেন, Artificial Intelligence।

    তিনটা নদীর তৃতীয়টা জন্ম নিলো। জন্মের সময়ই তার কপালে লেখা হয়ে গেল অতিরিক্ত প্রত্যাশার অভিশাপ।

    শুরুটা অবশ্য স্বপ্নের মতই হলো। কম্পিউটার চেকার্স খেলা শিখলো, এবং নিজের প্রোগ্রামারকেই হারিয়ে দিলো। অঙ্কের উপপাদ্য প্রমাণ করলো। সহজ ইংরেজিতে অ্যালজেব্রার প্রশ্ন বুঝলো। ELIZA নামের এক চ্যাটবট এলো, সাইকোথেরাপিস্ট সাজতো, আর মানুষ এতটাই মজে গেল যে অনেকে বিশ্বাস করা শুরু করলো ওপাশে সত্যিকার কেউ আছে।

    ১৯৫৮ সালেই পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে, নেভি এমন মেশিনের আশা করছে যেটা হাঁটবে, কথা বলবে, দেখবে, লিখবে, এমনকি নিজের অস্তিত্ব টের পাবে।

    বিজ্ঞানীরাও কম যাননি। একজন শীর্ষ গবেষক ঘোষণা দিলেন, বিশ বছরের মধ্যে মেশিন মানুষের সব কাজ করতে পারবে।

    সরকারি টাকা ঝরনার মত ঝরলো। মিলিটারি টাকা ঢাললো। ল্যাবে ল্যাবে উৎসব।

    আপনি নিশ্চয়ই টের পাচ্ছেন, গল্প যখন এত মধুর, তখন সামনে খাদ আছে।

    খাদটা এলো একদম সরল জায়গা থেকে।

    দেখা গেল, মেশিন দাবার চাল পারে, ক্যালকুলাসের অঙ্ক পারে, কিন্তু তিন বছরের বাচ্চা যা পারে তা পারে না। ছবিতে বিড়াল আর কুকুর আলাদা করতে পারে না। “বলটা টেবিল থেকে পড়ে ভেঙে গেল” শুনে বুঝতে পারে না কোনটা ভাঙলো, বল না টেবিল। যে কমন সেন্স রিকশাওয়ালা মামারও অগাধ, কোটি টাকার মেশিনের তা শূন্য।

    কেন? কারণ তখনকার পদ্ধতিটাই ছিল উল্টো। প্রোগ্রামাররা মেশিনকে নিয়ম মুখস্থ করাতেন। যদি এই হয়, তাহলে ওই করো। হাজার হাজার নিয়ম।

    কিন্তু দুনিয়াটা নিয়মে ধরা যায় না। “বিড়াল চেনার” নিয়ম লিখে দেখান তো? চার পা, লেজ, গোঁফ? সেটা তো বাঘও।

    প্রতিশ্রুতির বেলুন যত বড় হয়েছিল, ফাটার আওয়াজও হলো তত জোরে।

    ১৯৭৩ সালে ব্রিটিশ সরকারের এক রিপোর্ট AI গবেষণাকে প্রায় মৃত ঘোষণা করলো। আমেরিকাতেও ফান্ডিং কাটা শুরু।

    টাকার ঝরনা বন্ধ। উৎসবের বাতি নিভলো।

    শীত আসছিল।

    পর্ব ৯: শীতকাল

    এই পর্বটা একটু অন্যভাবে বলি। কোনো নাটকীয়তা না। শুধু কয়েকটা দৃশ্য।

    দৃশ্য এক। সত্তরের দশকের শেষ। এক ইউনিভার্সিটির করিডোর। এক তরুণ গবেষক তার প্রফেসরের রুম থেকে বের হয়ে এলেন। গ্র্যান্ট আবেদন আবার রিজেক্ট। কারণ আবেদনে “নিউরাল নেটওয়ার্ক” শব্দটা ছিল। সিনিয়র এক প্রফেসর করিডোরে দেখা হতেই মুচকি হেসে বললেন, “এখনো ওই মরা ঘোড়া নিয়ে পড়ে আছো?”

    দৃশ্য দুই। এক কনফারেন্স। রেজিস্ট্রেশন ফর্মে গবেষকরা নিজেদের ফিল্ডের নাম লিখছেন “প্যাটার্ন রিকগনিশন”, “ইনফরমেশন প্রসেসিং”, যেকোনো কিছু। শুধু একটা শব্দ কেউ লিখছে না।

    Artificial Intelligence।

    শব্দটা তখন গালির মত। CV-তে লিখলে চাকরি হয় না।

    দৃশ্য তিন। একজন গবেষকের সংসার। মাসের শেষে হিসাবের খাতা। বাচ্চার স্কুলের বেতন। স্ত্রীর ক্লান্ত প্রশ্ন, “এই জিনিস দিয়ে কী হবে বলো তো? সবাই তো বলছে ভুয়া।”

    উত্তর নেই। শুধু জেদ আছে।

    এর নাম AI Winter। শীতকাল। আর এটা একবার না, এসেছে দুইবার। আশির দশকে “এক্সপার্ট সিস্টেম” নামে একটা ঢেউ উঠে আবার ধপ করে পড়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় শীত ছিল আরো নিষ্ঠুর, কারণ সেটা ছিল দ্বিতীয়বার ভেঙে যাওয়া বিশ্বাসের শীত।

    কত মেধাবী মানুষ এই শীতে ফিল্ড ছেড়ে চলে গেছেন, ব্যাংকে, অন্য সাবজেক্টে, হিসাব নেই। বিজ্ঞানের ইতিহাস শুধু জয়ের গল্প লেখে। হেরে হারিয়ে যাওয়াদের নাম কোথাও থাকে না।

    কিন্তু।

    এই গল্পে একটা “কিন্তু” আছে বলেই আজ আপনি এই লেখা পড়ছেন।

    শীতের মধ্যেও কয়েকজন কাজ ছাড়েননি। জিওফ্রি হিন্টন নামে এক ব্রিটিশ-কানাডিয়ান, ইয়ান লেকান নামে এক ফরাসি, ইয়োশুয়া বেনজিও নামে আরেকজন। আরো কিছু নাম-না-জানা জেদি মানুষ। ফান্ড নেই, সম্মান নেই, চাকরির বাজারে দাম নেই।

    আছে শুধু একটা বিশ্বাস।

    হিন্টনকে পরে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সবাই যখন বলছিল ভুল পথ, আপনি টিকলেন কীভাবে। ওনার উত্তরের সারমর্মটা ছিল এরকম, মস্তিষ্ক তো কোনোভাবে কাজ করেই। মস্তিষ্ক যেহেতু পারে, মেশিনও পারবে। প্রকৃতি প্রমাণ করে রেখেছে এটা সম্ভব।

    কী সেই বিশ্বাস, কেন সেটা এত আলাদা ছিল, পরের পর্বে খুলে বলবো।

    আপাতত শুধু এটুকু জানেন। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি বিপ্লবের বীজ রোপণ হয়েছিল তার সবচেয়ে অন্ধকার শীতে, কিছু “ব্যর্থ” মানুষের হাতে।

    যাদের করিডোরে দেখে লোকে হাসতো।

    পর্ব ১০: যে মেশিন মুখস্থ করে না, শেখে

    আচ্ছা, আপনি সাইকেল চালানো শিখেছিলেন কীভাবে?

    কেউ কি আপনাকে ফিজিক্সের ফর্মুলা লিখে দিয়েছিল? ভারসাম্যের সমীকরণ? টর্ক, মোমেন্টাম?

    না। আপনি উঠেছিলেন, পড়ে গিয়েছিলেন, হাঁটুর চামড়া ছিলেছিল, আবার উঠেছিলেন। শত শত ভুলের ভেতর দিয়ে আপনার মস্তিষ্ক নিজেই নিয়মটা বের করে নিয়েছিল। এমন নিয়ম, যেটা আপনি আজও মুখে বলতে পারবেন না, কিন্তু শরীর জানে।

    এটাই শেখা। আর এটাই ছিল সেই জেদি গবেষকদের বিশ্বাস।

    তারা বললেন, মেশিনকে নিয়ম মুখস্থ করানো বাদ দাও। মেশিনকে শেখার ক্ষমতা দাও। তারপর উদাহরণ দেখাও। বাকিটা সে নিজে করবে।

    এই পদ্ধতির নাম Machine Learning। মেশিন লার্নিং। আজকের সব AI-এর মেরুদণ্ড।

    কীভাবে কাজ করে, একটা দেশি উদাহরণে বুঝেন।

    ধরেন আপনি নতুন কাজের লোককে বাজারে পাঠাচ্ছেন ভালো ইলিশ চেনা শেখাতে। আপনি কি তাকে খাতায় লিখে দেন, “চোখ এত মিলিমিটার স্বচ্ছ হইলে ভালো”? দেন না। আপনি তাকে সাথে নিয়ে যান। এটা ভালো, ওটা পচা, এটার কানকো দেখ, ওটার গন্ধ শোঁক। বিশ দিন বাজার করার পর সে নিজেই ওস্তাদ। কোন নিয়মে চিনছে, সে নিজেও গুছিয়ে বলতে পারবে না। কিন্তু চিনছে ঠিকই।

    মেশিন লার্নিং ঠিক এটাই। ডেটা দেখাও, ভুল ধরিয়ে দাও, মেশিন নিজের ভেতরের লাখো “নব” একটু একটু ঘুরিয়ে নিজেকে ঠিক করে নেবে।

    আর এর সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী রূপটার নাম নিউরাল নেটওয়ার্ক। মানুষের মস্তিষ্কের নিউরনের আদলে বানানো কৃত্রিম নিউরনের জাল। স্তরের পর স্তর। হিন্টনরা আশির দশকেই দেখিয়েছিলেন কীভাবে এই জালকে দক্ষভাবে ট্রেনিং করানো যায়, ভুল থেকে পেছন দিকে শিখিয়ে শিখিয়ে।

    থিওরি রেডি। পদ্ধতি রেডি।

    তাহলে বিপ্লবটা আশির দশকেই হলো না কেন? কেন লাগলো আরো তিরিশ বছর?

    এইখানে এসে গল্পটা একটা গভীর সত্যের সামনে দাঁড়ায়।

    সাইকেল শেখার জন্য যেমন শত শত বার পড়তে হয়, মেশিনের শেখার জন্য লাগে লাখো কোটি উদাহরণ। ছবি, লেখা, শব্দ। এক কথায়, ডেটা। পাহাড় পরিমাণ ডেটা।

    আর সেই পাহাড় হজম করার জন্য লাগে দানব পরিমাণ কম্পিউটিং পাওয়ার।

    আশির দশকে দুটোর একটাও ছিল না। ইন্টারনেট নেই, ডিজিটাল ক্যামেরা নেই, মানুষের জীবন তখনো কাগজে-কলমে। আর কম্পিউটার? মুরের ল-এর দৌড় তখনো মাঝপথে।

    বীজ ছিল। মাটি ছিল না, পানি ছিল না।

    তাই বীজটা ঘুমিয়ে রইলো।

    আর এখানেই এই পুরো সিরিজের সবচেয়ে অদ্ভুত সুন্দর ব্যাপারটা লুকিয়ে আছে। পরের পর্বে সেটা বলবো। শুধু একটা প্রশ্ন দিয়ে শেষ করি।

    কখনো ভেবেছেন, আপনি ফেসবুকে যে ছবিটা আপলোড করলেন, যে কমেন্টটা লিখলেন, সেটা ইতিহাসে কী ভূমিকা রাখলো?

    ভাবেননি তো?

    তাহলে পরের পর্বটা আপনার জন্যই।

    পর্ব ১১: সবকিছুর একটা সময় আছে

    এই পর্বের নায়ক কোনো বিজ্ঞানী না।

    এই পর্বের নায়ক আপনি।

    হ্যাঁ, আপনি। যিনি এই মুহূর্তে ফোন হাতে স্ক্রল করছেন। একটু ব্যাখ্যা করি।

    নব্বইয়ের দশকে ইন্টারনেট এলো। প্রথমে ধীরে। ডায়াল-আপের সেই ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ যারা শুনেছেন, তারা জানেন। তারপর জোয়ার। ২০০০ সালে অনলাইনে ছিল কয়েক কোটি মানুষ। তারপর এলো সস্তা মোবাইল, তারপর স্মার্টফোন, তারপর ফেসবুক-ইউটিউব।

    আজ অনলাইনে মানুষ পাঁচশো কোটির বেশি।

    আর এই কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন কী করছে? ছবি তুলছে। স্ট্যাটাস লিখছে। ভিডিও বানাচ্ছে। রিভিউ দিচ্ছে। কমেন্টে ঝগড়া করছে। বিড়ালের ছবিতে হাহা দিচ্ছে।

    প্রতিটা ক্লিক, প্রতিটা ক্যাপশন, প্রতিটা ট্যাগ। সব জমা হচ্ছে।

    এবার আগের পর্বের কথাটা মনে করেন। মেশিন লার্নিংয়ের ক্ষুধা ছিল ডেটার। লাখো কোটি উদাহরণের।

    বুঝতে পারছেন কী ঘটে গেল?

    মানবজাতি না জেনে, না বুঝে, সম্পূর্ণ বেখেয়ালে, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পাঠ্যবই লিখে ফেললো। মানুষের ভাষা, চিন্তা, রসিকতা, রাগ, ভালোবাসা, জ্ঞান, সব ডিজিটাল অক্ষরে বন্দি হলো। কোটি কোটি লেবেল করা ছবি। এই যে বিড়াল, এই যে বিয়েবাড়ি, এই যে সূর্যাস্ত।

    যে খাবারের অভাবে মেশিন লার্নিং তিরিশ বছর না খেয়ে ঘুমিয়ে ছিল, সেই খাবার এখন সমুদ্র হয়ে ফুঁসছে।

    এবার পেছনে তাকান। পুরো টাইমলাইনটা একসাথে দেখেন।

    পঞ্চাশের দশকে যদি নিউরাল নেটওয়ার্কের থিওরি পুরোপুরি সফল হতো? লাভ হতো না। ডেটা নেই, কম্পিউটার নেই। আশির দশকে হিন্টনরা পদ্ধতি বের করলেন? তবু হলো না। কারণ ইন্টারনেট তখনো শিশু, চিপ তখনো দুর্বল।

    আবার উল্টোটা ভাবেন। ইন্টারনেট যদি আগে আসতো, কিন্তু শেখার অ্যালগরিদম না থাকতো? ডেটার পাহাড় পড়ে থাকতো অর্থহীন আবর্জনার মত।

    তিনটা জিনিস লাগতো একসাথে। শেখার পদ্ধতি। ডেটার সমুদ্র। আর সেই সমুদ্র মন্থনের মত শক্তিশালী চিপ।

    তিনটা তিন আলাদা ইতিহাস থেকে এসে ঠিক একই দশকে, ২০১০-এর আশেপাশে, একসাথে পাকলো।

    আগে না। পরে না। ঠিক সময়ে।

    দাদি-নানিরা একটা কথা বলতেন না? সবকিছুর একটা সময় আছে। আম কাঁচা থাকতে পাড়লে টক, বেশি রেখে দিলে পচা।

    প্রযুক্তির ইতিহাসও দেখি সেই নিয়মেই চলে। আর সবচেয়ে শিরশিরে ব্যাপারটা হলো, এই পাকার প্রক্রিয়ায় শেষ উপাদানটা দিয়েছেন আপনি। আপনার আপলোড করা ছবি। আপনার লেখা কমেন্ট।

    মেশিনকে পড়তে শিখিয়েছে মানুষের লেখা। মেশিনকে দেখতে শিখিয়েছে মানুষের চোখে দেখা মুহূর্তগুলো।

    আমরা সবাই, পাঁচশো কোটি মানুষ, না জেনে একটা কিছুর শিক্ষক হয়ে গেছি।

    ছাত্রটা কেমন হলো, সেটা এখন দেখবেন।

    তবে তার আগে, ছোট্ট একটা ডিট্যুর। ১৯৮১ সালে এক ঠাট্টাবাজ নোবেলজয়ী মঞ্চে উঠে এমন এক প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যেটা শুনে মানুষ হেসেছিল।

    এখন আর কেউ হাসে না।

    পর্ব ১২: পাগলের প্রস্তাব

    রিচার্ড ফাইনম্যানকে চেনেন?

    নোবেলজয়ী ফিজিসিস্ট। কিন্তু নোবেলের চেয়ে বড় পরিচয়, উনি ছিলেন বিজ্ঞানের সবচেয়ে মজার মানুষ। বঙ্গো ড্রাম বাজাতেন। লস আলামোসের পারমাণবিক গবেষণাগারে কাজ করার সময় শখের বশে টপ-সিক্রেট সেফের তালা খুলে ভেতরে চিরকুট রেখে আসতেন, সিকিউরিটির লোকজনের হার্ট অ্যাটাকের দশা।

    ১৯৮১ সালে সেই ফাইনম্যান MIT-র এক কনফারেন্সে উঠলেন। শ্রোতা সব কম্পিউটার বিজ্ঞানী। আর উনি এসেই তাদের সাধের কম্পিউটারের একটা সীমা দেখিয়ে দিলেন।

    যুক্তিটা এরকম। ধরো তুমি প্রকৃতির একটা ছোট্ট টুকরা সিমুলেট করবে। একটা অণু। অণু চলে কোয়ান্টাম নিয়মে, মানে একসাথে বহু অবস্থায় থাকে।

    এখন হিসাব করো। মাত্র কয়েকশো কণার সব সম্ভাব্য অবস্থা লিখে রাখতে যত মেমোরি লাগবে, এই মহাবিশ্বের সব পরমাণু দিয়ে কম্পিউটার বানালেও তত মেমোরি হবে না।

    হলজুড়ে নীরবতা।

    তারপর ফাইনম্যান দিলেন সেই প্রস্তাব। ওনার কথার সারমর্ম ছিল, প্রকৃতি যেহেতু কোয়ান্টাম, তাকে বুঝতে হলে সিমুলেটরটাকেও হতে হবে কোয়ান্টাম। এমন কম্পিউটার বানাও, যার কলকব্জাই চলবে কোয়ান্টাম নিয়মে।

    অনেকে ভাবলো, বুড়ো মজা করছে। বরাবরের মত।

    কিন্তু কয়েকজনের মাথায় আইডিয়াটা কাঁটার মত বিঁধে গেল। তারা হিসাব কষতে বসলো। আর হিসাব থেকে বেরিয়ে এলো এমন এক সম্ভাবনা, যেটা মুরের ল-কেও শিশু বানিয়ে দেয়।

    ব্যাপারটা লুডু দিয়ে বুঝেন।

    সাধারণ কম্পিউটারের বিট হলো চাল দেওয়ার পরের ছক্কা। থেমে আছে, একটা সংখ্যা দেখাচ্ছে। হয় ০ নয় ১।

    আর কোয়ান্টাম বিট, ডাকনাম কিউবিট, হলো শূন্যে ঘুরন্ত ছক্কা। সব সংখ্যা একসাথে। যতক্ষণ না মাটিতে পড়ছে, ততক্ষণ সে সব সম্ভাবনায় বাঁচে।

    একটা কিউবিট মানে একসাথে ২টা অবস্থা। দুইটা মানে ৪। তিনটা মানে ৮। দ্বিগুণের সেই খেলা, কাগজ ভাঁজের সেই জাদু, মনে আছে?

    মাত্র ৩০০ কিউবিট মানে মহাবিশ্বের সব পরমাণুর চেয়ে বেশি অবস্থা। একসাথে।

    আর এই কিউবিটগুলোকে একসূত্রে বাঁধা হবে কী দিয়ে জানেন?

    Entanglement দিয়ে। পর্ব ২-এর সেই “ভুতুড়ে কাণ্ড”। আইনস্টাইন যেটাকে থিওরির লজ্জা ভেবেছিলেন, দেখা গেল সেটাই নতুন মেশিনের ইঞ্জিন।

    আইনস্টাইন ভূত তাড়াতে চেয়েছিলেন। ভবিষ্যৎ ঠিক করলো, ভূতটাকেই চাকরি দেবে।

    ইতিহাসের এর চেয়ে নিষ্ঠুর রসিকতা আর কী হতে পারে?

    তবে এত সহজও না ব্যাপারটা। এই ঘুরন্ত ছক্কার একটা মারাত্মক সমস্যা আছে।

    তাকে ছোঁয়া যায় না। এমনকি জোরে তাকানোও যায় না।

    পর্ব ১৩: অভিমানী ছক্কা

    পর্ব ১৩: অভিমানী ছক্কা
    আইবিএমের একটা কোয়ান্টাম কম্পিউটার। সোনালি ঝাড়বাতির মত দেখতে অংশটাই ফ্রিজের চেম্বার, যেখানে কিউবিট ঠান্ডা রাখা হয়। ছবি: Lars Plougmann, CC BY-SA ২.০ — Wikimedia Commons

    একটা দৃশ্য কল্পনা করেন।

    আপনার হাতে বিশ্বের সবচেয়ে দামি জিনিস, একটা কিউবিট। সে এখন ঘুরন্ত ছক্কা, একসাথে ০ আর ১। তার এই জাদুকরী অবস্থার নাম সুপারপজিশন।

    এখন পাশের রুমে কেউ দরজা লাগালো, ঠাস।

    ব্যস। ছক্কা পড়ে গেল। জাদু শেষ।

    একটু তাপ, একটু কম্পন, একটা বেয়াড়া ফোটন, তাতেই কিউবিটের কোয়ান্টাম অবস্থা ভেঙে সে সাধারণ বিট হয়ে যায়। এই ভাঙনের নাম ডিকোহেরেন্স। কোয়ান্টাম ইঞ্জিনিয়ারদের রাতের ঘুম কাড়া শব্দ।

    জিনিসটা কতটা স্পর্শকাতর বোঝাতে ইঞ্জিনিয়াররা বলেন, কোয়ান্টাম কম্পিউটার বানানো মানে সার্কাসের হাজারটা ঘুরন্ত প্লেট একসাথে সামলানো, ভূমিকম্পের মধ্যে দাঁড়িয়ে।

    তাহলে সমাধান কী? কিউবিটকে দুনিয়া থেকে লুকিয়ে ফেলা।

    সেজন্য কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ছবি দেখলে দেখবেন সোনালি ঝাড়বাতির মত একটা জিনিস, ফ্রিজের মত চেম্বারে ঝুলছে। ওই চেম্বারের ভেতরের তাপমাত্রা কত জানেন?

    পরম শূন্যের কাছাকাছি। মাইনাস ২৭৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশেপাশে।

    মহাশূন্যের চেয়েও ঠান্ডা। এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে ঠান্ডা জায়গাগুলো কোনো মেরু অঞ্চলে না। সেগুলো কোয়ান্টাম ল্যাবের ভেতরে।

    আর এত করেও কিউবিট ভুল করে। ঘন ঘন ভুল করে। তাই দরকার হয় এরর কারেকশন, মানে অনেকগুলো নড়বড়ে কিউবিট মিলে একটা নির্ভরযোগ্য কিউবিটের কাজ করা। ব্যাপারটা অনেকটা নড়বড়ে বাঁশ একসাথে বেঁধে মজবুত সাঁকো বানানোর মত।

    এই এক সমস্যায় কেটে গেছে দশকের পর দশক। নব্বই আর দুই হাজারের দশকজুড়ে কোয়ান্টাম কম্পিউটার ছিল ল্যাবের খেলনা। দুই কিউবিট, পাঁচ কিউবিট, দশ কিউবিট। সমালোচকরা ঠাট্টা করতো, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং হলো ভবিষ্যতের প্রযুক্তি, এবং চিরকাল ভবিষ্যতেরই থাকবে।

    কিন্তু একটা জিনিস সমালোচকরা খেয়াল করেননি।

    গণিতবিদরা এর মধ্যেই দেখিয়ে ফেলেছেন, একটা যথেষ্ট বড় কোয়ান্টাম কম্পিউটার কী কী করতে পারবে। তার একটা ক্ষমতা শুনে দুনিয়ার সব গোয়েন্দা সংস্থার ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল।

    আপনার ব্যাংকের লেনদেন, মেসেজের এনক্রিপশন, দেশের গোপন ফাইল, সবকিছুর তালা যে গণিত দিয়ে বানানো, বড়সড় নিখুঁত এক কোয়ান্টাম কম্পিউটার সেই তালা ভাঙতে পারবে। বিশেষ এক অ্যালগরিদমে।

    মানে যার হাতে প্রথম বড় কোয়ান্টাম কম্পিউটার, তার হাতে দুনিয়ার সব তালার মাস্টার-চাবি।

    এই একটা কারণেই আমেরিকা, চীন, ইউরোপ, বড় বড় টেক কোম্পানি, সবাই নিঃশব্দে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঢালা শুরু করলো। পত্রিকায় হেডলাইন হয় না, কিন্তু দৌড় চলছে। ঠান্ডা, নীরব, ভয়ংকর এক দৌড়।

    সেই দৌড়ের গল্পে আমরা ফিরবো।

    কারণ ঠিক এই সময়ে, ২০১২ সালে, গল্পের আরেক নদীতে বাঁধ ভেঙে গেল।

    তিনজন মানুষ। একটা প্রতিযোগিতা। আর দুইটা গেমিং কার্ড।

    পর্ব ১৪: তিনজন মানুষ আর দুইটা গেমিং কার্ড

    ২০১২ সাল। একটা প্রতিযোগিতা চলছে, নাম ImageNet চ্যালেঞ্জ।

    কাজ শুনলে হাসবেন। ছবি দেখে বলতে হবে ছবিতে কী। বিড়াল না কুকুর। মাশরুম না ছাতা।

    আপনার তিন বছরের ভাগ্নি এটা হেসে খেলে পারে। পৃথিবীর সেরা কম্পিউটার সিস্টেমগুলো পারতো না। ভুলের হার ২৫ শতাংশের উপরে, মানে প্রতি চারটায় একটা ভুল। প্রতি বছর বাঘা বাঘা টিম নামে, উন্নতি হয় এক-দুই শতাংশ। এই তো অবস্থা।

    সেই বছর টরন্টো থেকে নামলো তিনজনের এক টিম। জিওফ্রি হিন্টন, সেই শীতকালের জেদি বুড়ো, আর তার দুই ছাত্র, অ্যালেক্স ক্রিজেভস্কি আর ইলিয়া সুতস্কেভার।

    তাদের অস্ত্র? সেই “মরা ঘোড়া”। ডিপ নিউরাল নেটওয়ার্ক।

    কিন্তু এবার প্রেক্ষাপট বদলে গেছে। মনে করেন পর্ব ১১। ডেটার সমুদ্র এসে গেছে, ImageNet-এ লাখ লাখ লেবেল করা ছবি, কোটি মানুষের ইন্টারনেটে তোলা মুহূর্ত।

    আর কম্পিউটিং পাওয়ার?

    এখানেই গল্পের সবচেয়ে মজার টুইস্ট। অ্যালেক্স ট্রেনিং চালালো দুইটা NVIDIA গেমিং গ্রাফিক্স কার্ডে। GPU। নিজের ঘরে বসে।

    GPU জিনিসটা বানানোই হয়েছিল ছেলেপেলের ভিডিও গেমের জন্য, স্ক্রিনের লাখো পিক্সেল একসাথে রেন্ডার করতে। দেখা গেল, লাখো হিসাব একসাথে করার এই ক্ষমতাটাই নিউরাল নেটওয়ার্ক ট্রেনিংয়ের জন্য জাদুর চেরাগ। পর্ব ৬-৭ এর সেই বালির চিপ, মুরের ল-এর পঞ্চাশ বছরের দৌড়, সব এসে জমা হয়েছে এই গেমিং কার্ডে।

    মানে ভাবেন। বিশ্বের কিশোররা গেম খেলে খেলে যে ইন্ডাস্ট্রি দাঁড় করালো, সেই ইন্ডাস্ট্রির চিপ হয়ে গেল AI বিপ্লবের ইঞ্জিন। ইতিহাস কীভাবে কাজ করে দেখেছেন? সদর দরজা দিয়ে না, রান্নাঘরের জানালা দিয়ে।

    ফলাফল ঘোষণার দিন।

    তাদের মডেল AlexNet ভুল করলো মাত্র ১৫ শতাংশের কিছু বেশি। দ্বিতীয় স্থানের চেয়ে প্রায় দশ শতাংশ ভালো।

    প্রতিযোগিতায় দশ শতাংশ ব্যবধান মানে বোঝেন? এটা ১০০ মিটার দৌড়ে দুই সেকেন্ড আগে ফিনিশ করার মত। এটা প্রতিযোগিতা না, গণহত্যা।

    কম্পিউটার ভিশনের জগতে সেই রাতটা ছিল ভূমিকম্প। যারা সারাজীবন নিউরাল নেটওয়ার্ককে ঠাট্টা করেছে, তারা রাতারাতি নিজেদের গবেষণার দিক ঘুরিয়ে ফেললো। এক গবেষকের মন্তব্য ভাইরাল হয়েছিল, সারমর্ম এমন, আমরা যে যুদ্ধে ত্রিশ বছর হারছিলাম, ওরা সেটা এক সন্ধ্যায় জিতে নিলো।

    শীতকাল শেষ।

    শুধু শেষ না। এবার শুরু হলো এমন এক গ্রীষ্ম, যার তাপে গোটা পৃথিবী বদলে যাবে।

    গুগল, ফেসবুক, মাইক্রোসফট, চীনের কোম্পানিরা, সবাই পাগলের মত নিউরাল নেটওয়ার্ক গবেষক কিনতে লাগলো। হিন্টনের ছোট্ট কোম্পানি নিলামে বিক্রি হলো কোটি কোটি ডলারে।

    করিডোরে যাকে দেখে লোকে হাসতো, তার ছাত্রদের বেতন হয়ে গেল ফুটবল তারকাদের সমান।

    আর চার বছরের মাথায় এই প্রযুক্তি এমন একটা কাজ করলো, যেটা দেখে একজন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন মানুষ প্রথমে হাসলেন।

    তারপর চুপ হয়ে গেলেন।

    তারপর উঠে বাইরে চলে গেলেন, সিগারেট ধরাতে।

    পর্ব ১৫: ৩৭ নম্বর চাল

    পর্ব ১৫: ৩৭ নম্বর চাল
    এটা ম্যাচের ছবি না; এটা AlphaGo যে সার্ভার হার্ডওয়্যারে চলতো, তার একটা বাস্তব ছবি। পাবলিক ডোমেইন (CC0) — Wikimedia Commons

    ২০১৬ সালের মার্চ। সিউল। ফোর সিজনস হোটেল।

    এক পাশে লি সেডল। গো খেলার জীবন্ত কিংবদন্তি, ১৮টা আন্তর্জাতিক শিরোপা। গো খেলাটা চেনেন তো? পূর্ব এশিয়ার আড়াই হাজার বছরের পুরনো বোর্ড গেম। দাবার চেয়ে বহুগুণ জটিল। সম্ভাব্য বোর্ড পজিশনের সংখ্যা মহাবিশ্বের পরমাণুর চেয়ে বেশি। গো-তে হিসাব করে জেতা যায় না, লাগে ইনটুইশন। অন্তর্দৃষ্টি। যেটাকে সবাই বলতো মানুষের একান্ত সম্পত্তি।

    অন্য পাশে AlphaGo। গুগল ডিপমাইন্ডের প্রোগ্রাম, যে শিখেছে লাখ লাখ মানুষের খেলা দেখে, তারপর নিজের সাথে নিজে কোটি কোটি ম্যাচ খেলে।

    ম্যাচের আগে লি সেডল আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। বলেছিলেন ৫-০ তে জিতবেন, বড়জোর ৪-১।

    পুরো কোরিয়া টিভির সামনে। কোটি মানুষ লাইভ দেখছে।

    প্রথম ম্যাচ। AlphaGo জিতলো। কোরিয়া স্তব্ধ।

    তারপর দ্বিতীয় ম্যাচ। ৩৭ নম্বর চাল।

    AlphaGo একটা পাথর বসালো বোর্ডের এমন এক জায়গায়, যেখানে আড়াই হাজার বছরের গো-জ্ঞান বলে ওই চাল দিতে নেই। ধারাভাষ্যকার, নিজে পেশাদার খেলোয়াড়, লাইভে বলে ফেললেন যে এটা সম্ভবত ভুল, মিসক্লিক টাইপের কিছু।

    লি সেডল বোর্ডের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর উঠে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। প্রায় পনেরো মিনিট পরে ফিরলেন।

    খেলা যত গড়ালো, তত পরিষ্কার হলো ভয়ংকর সত্যটা। ৩৭ নম্বর চালটা ভুল ছিল না।

    চালটা ছিল সুন্দর। অচেনা রকমের সুন্দর। পরে হিসাব করে দেখা গেছে, AlphaGo জানতো কোনো মানুষ ওই চাল দেওয়ার সম্ভাবনা দশ হাজারে এক। সে জেনেশুনেই দিয়েছে। কারণ সে মানুষের বই মুখস্থ করেনি।

    সে খেলাটা নিজের মত করে বুঝেছে

    আড়াই হাজার বছর ধরে মানুষ যে গাছের ফল খাচ্ছিল, মেশিন সেই গাছের এমন ডাল দেখালো যেটার অস্তিত্বই কেউ জানতো না।

    ফাইনাল স্কোর ৪-১। ওই একটা জয়, চতুর্থ ম্যাচে লি সেডলের সেই অসাধারণ ৭৮ নম্বর চাল, ওটা এখন পর্যন্ত বড় মঞ্চে শীর্ষ AI-এর বিরুদ্ধে মানুষের শেষ বিখ্যাত জয়গুলোর একটা হয়ে ইতিহাসে ঢুকে গেছে।

    ম্যাচ শেষে লি সেডল ক্ষমা চেয়েছিলেন দেশবাসীর কাছে। ভাবেন, ৪-১ হেরে ক্ষমা। কারণ উনি বুঝেছিলেন, উনি শুধু একটা ম্যাচ হারেননি।

    তিন বছর পরে, ২০১৯ সালে, মাত্র ৩৬ বছর বয়সে লি সেডল পেশাদার গো থেকে অবসর নিলেন। কারণ হিসেবে বলেছিলেন, এমন এক সত্তা এসে গেছে যাকে হারানো যায় না।

    এই জায়গায় এসে একটু থামেন। একটা নিঃশ্বাস নেন।

    কারণ এতক্ষণ মেশিন খেলছিল খেলা। বোর্ডের ৩৬১টা ঘরের ভেতরে।

    এরপর মেশিন যে জিনিসটা শিখবে, সেটার কোনো বোর্ড নেই, কোনো সীমানা নেই।

    সেটা মানুষের ভাষা।

    পর্ব ১৬: পর্দার আড়ালে কে

    ২০১৭ সালে গুগলের কয়েকজন গবেষক একটা পেপার ছাপলেন। নাম শুনলে মনে হবে মজা করছে।

    “Attention Is All You Need.”

    এই পেপারে ছিল নিউরাল নেটওয়ার্কের নতুন এক নকশা। নাম ট্রান্সফরমার। এর বিশেষত্ব, সে একটা বাক্যের সব শব্দের দিকে একসাথে “মনোযোগ” দিতে পারে, কোন শব্দের সাথে কোন শব্দের সম্পর্ক, সেটা নিজে নিজে বের করে ফেলে। আর তাকে ট্রেনিং করানো যায় হাজার হাজার GPU-তে একসাথে।

    মানে এতদিনের তিনটা উপাদান, শেখার অ্যালগরিদম, ডেটার সমুদ্র, চিপের পাহাড়, এই নকশা তিনটাকেই পুরোদমে কাজে লাগাতে পারে।

    তারপর গবেষকরা করলেন সাহসী এক পরীক্ষা। এই ট্রান্সফরমারকে খাওয়ানো শুরু করলেন মানুষের লেখা। বই, উইকিপিডিয়া, ওয়েবসাইট, ফোরাম। পর্ব ১১-তে যে সমুদ্রের কথা বললাম, সেই সমুদ্র।

    আর শেখালেন একটাই খেলা। পরের শব্দটা অনুমান করো।

    “আজ আকাশে অনেক…” কী হবে? মেঘ।

    তুচ্ছ মনে হচ্ছে? সবার তাই মনে হয়েছিল।

    কিন্তু ভেবে দেখেন, পরের শব্দটা সত্যিই ভালোভাবে অনুমান করতে হলে কী কী জানতে হয়। ব্যাকরণ। তথ্য। যুক্তি। কে কাকে কী বলছে। এমনকি রসবোধ। “পরের শব্দ” অনুমানের খেলার ভেতর দিয়ে মেশিন আসলে গিলে ফেলছিল মানুষের চিন্তার গোটা কাঠামো।

    মডেল বড় হলো। আরো বড়। প্রতিবার বড় করার সময় দেখা গেল, মডেল শুধু ভালো হচ্ছে না, নতুন নতুন ক্ষমতা গজাচ্ছে। কেউ শেখায়নি, তবু অনুবাদ পারছে। কেউ শেখায়নি, তবু কোড লিখছে।

    গবেষকরা নিজেরাই মাঝে মাঝে চমকে যাচ্ছিলেন।

    তারপর ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর। OpenAI চুপচাপ একটা ওয়েবসাইট ছাড়লো। ChatGPT। নিজেরাও ভেবেছিল ছোটখাটো ডেমো, লোকজন একটু নাড়াচাড়া করবে।

    পাঁচ দিনে ইউজার হলো দশ লাখ।

    দুই মাসে দশ কোটি। মানব ইতিহাসের দ্রুততম ছড়িয়ে পড়া কনজিউমার অ্যাপ।

    হঠাৎ করে ঢাকার স্কুলছাত্র থেকে টোকিওর ইঞ্জিনিয়ার, সবাই পর্দার সামনে বসে একটা মেশিনের সাথে কথা বলছে। রচনা লেখাচ্ছে, কোড ঠিক করাচ্ছে, প্রেমপত্রের খসড়া চাইছে, মন খারাপের রাতে গল্প করছে।

    এবার ১৯৫০ সালে ফিরে যান এক সেকেন্ডের জন্য।

    এক ব্রিটিশ গণিতবিদ লিখেছিলেন, যদি পর্দার আড়ালে চ্যাট করে বুঝতে না পারো ওপাশে মানুষ না মেশিন, তাহলে মেনে নিতে হবে মেশিনটা চিন্তা করছে।

    লোকে তখন হেসেছিল। এমন আজগুবি কথা কেউ কখনো শোনেনি।

    বাহাত্তর বছর পরে কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন তার সেই প্রশ্নের ভেতরে বাস করছে। আর দার্শনিকরা এখনো তর্ক করছেন, এটা “আসল” চিন্তা নাকি চোখধাঁধানো নকল।

    টুরিং থাকলে কী বলতেন কে জানে। হয়তো মুচকি হেসে বলতেন, “বলেছিলাম।”

    কিন্তু গল্প এখানে থামলে তো হতোই।

    কারণ এই নতুন মস্তিষ্কগুলোর একটা খিদে আছে। যত বড় হচ্ছে, খিদেটা তত রাক্ষুসে হচ্ছে।

    এবং সেই খিদে মেটাতে গিয়ে মানুষ এমন এক দরজায় টোকা দিচ্ছে, যেটার কথা শুনলে আপনার ভুরু কুঁচকে যাবে।

    পর্ব ১৭: রাক্ষসের খিদে

    একটা ছোট্ট প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি।

    আপনি AI-কে একটা প্রশ্ন করলেন। উত্তর আসতে লাগলো কয়েক সেকেন্ড। এই কয়েক সেকেন্ডে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও কী ঘটলো জানেন?

    কোনো এক ডেটা সেন্টারে হাজার হাজার চিপ একসাথে জ্বলে উঠলো। হিসাবে ভিন্নতা আছে, তবে মোটা দাগে একটা AI উত্তরে সাধারণ গুগল সার্চের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বিদ্যুৎ পোড়ে। এখন সেটাকে গুণ দেন দিনে শত কোটি প্রশ্ন দিয়ে।

    আর ট্রেনিং? একটা বড় মডেল ট্রেনিং মানে মাসের পর মাস, হাজার হাজার GPU, দিনরাত। যে বিদ্যুৎ খরচ হয়, তাতে হাজার হাজার সংসার বছর চলে যায়।

    মনে আছে পর্ব ৬-এ বলেছিলাম, ENIAC-এর বিদ্যুতের খিদের কথাটা মনে রাখতে? এই সেই গল্পের ফিরে আসা। আশি বছরে যন্ত্রের মস্তিষ্ক কোটি গুণ দক্ষ হয়েছে, কিন্তু আমাদের উচ্চাশা বেড়েছে তারো বেশি। ফলাফল, ডেটা সেন্টার এখন ছোটখাটো শহরের সমান বিদ্যুৎ গেলে।

    সংখ্যাগুলো ভয় ধরানোর মত। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাবে দুনিয়ার ডেটা সেন্টারগুলোর মিলিত বিদ্যুৎ খরচ এর মধ্যেই অনেক মাঝারি দেশের জাতীয় খরচকে ছাড়িয়ে গেছে, আর সামনের কয়েক বছরে সেটা দ্বিগুণের পথে। আমেরিকার কোথাও কোথাও নতুন ডেটা সেন্টার গ্রিডে যুক্ত হওয়ার জন্য বছরের পর বছর লাইনে অপেক্ষা করছে। কোথাও বিদ্যুতের দাম বাড়ছে, স্থানীয় মানুষ ক্ষুব্ধ।

    মানে দৃশ্যটা একবার ভাবেন। মানবজাতি ইতিহাসের সবচেয়ে বুদ্ধিমান যন্ত্র বানিয়ে ফেলেছে, আর সেই যন্ত্র আটকে যাচ্ছে সবচেয়ে পুরনো সমস্যায়।

    কারেন্ট নাই।

    লোডশেডিংয়ের দেশের মানুষ আমরা, এই অনুভূতি আমাদের হাড়ে হাড়ে চেনা। পরীক্ষার আগের রাতে কারেন্ট গেলে যেমন মোমবাতি খুঁজতে হয়, ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানিগুলো এখন সেই মোমবাতি খুঁজছে।

    আর তারা যে মোমবাতি খুঁজে পেলো, সেটার নাম শুনে দুনিয়া চমকে গেল।

    পরমাণু।

    মাইক্রোসফট চুক্তি করলো আমেরিকার সেই বিখ্যাত থ্রি মাইল আইল্যান্ডের পাশের বন্ধ হয়ে যাওয়া নিউক্লিয়ার ইউনিট আবার চালু করার জন্য, সব বিদ্যুৎ যাবে তাদের ডেটা সেন্টারে। গুগল, অ্যামাজন, মেটা, সবাই একের পর এক পারমাণবিক বিদ্যুতের চুক্তি সই করা শুরু করলো।

    সফটওয়্যার কোম্পানি কিনছে পারমাণবিক চুল্লির বিদ্যুৎ। দশ বছর আগে কেউ এই বাক্য বললে লোকে পাগল বলতো।

    কিন্তু পুরনো ধাঁচের বিশাল নিউক্লিয়ার প্লান্টের সমস্যা হলো, বানাতে লাগে দশ-পনেরো বছর, খরচ আকাশছোঁয়া, আর ধারেকাছে বড় নদী বা সাগর লাগে।

    AI অত অপেক্ষা করবে না। তার খিদে এখন।

    তাহলে?

    তাহলে দরকার এমন এক চুল্লি, যেটা কারখানায় বানানো যায়। ট্রাকে করে নেওয়া যায়। ডেটা সেন্টারের পাশেই বসানো যায়।

    শুনতে সায়েন্স ফিকশন লাগছে?

    জিনিসটার নাম SMR। আর এটাই সম্ভবত এই দশকের সবচেয়ে কম আলোচিত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি।

    পর্ব ১৮: পকেট সাইজ সূর্য

    SMR। Small Modular Reactor। ছোট মডুলার পারমাণবিক চুল্লি।

    নামের তিনটা শব্দই গুরুত্বপূর্ণ, খুলে বলি।

    Small, মানে ছোট। সাধারণ নিউক্লিয়ার প্লান্ট যেখানে এক গিগাওয়াট বা তারও বেশি বিদ্যুৎ দেয় আর লাগে বিশাল এলাকা, SMR দেয় তার দশ ভাগের এক ভাগ থেকে তিন ভাগের এক ভাগের মত। জায়গা লাগে কয়েকটা ফুটবল মাঠের সমান, কোনো কোনো ডিজাইনে তারো কম।

    Modular, মানে খণ্ডে খণ্ডে তৈরি। এইটাই আসল জাদু। পুরনো প্লান্ট বানানো হয় যেভাবে বাড়ি বানানো হয়, সাইটে ইট গেঁথে গেঁথে, বছর পনেরো ধরে। SMR বানানো হবে যেভাবে গাড়ি বানানো হয়। কারখানায়, অ্যাসেম্বলি লাইনে। তারপর মডিউলগুলো ট্রাক বা জাহাজে করে সাইটে নিয়ে জোড়া দাও। দরকার বাড়লে পাশে আরেকটা বসাও। লেগো ব্লকের মত।

    Reactor, মানে ভেতরের বিজ্ঞানটা সেই পুরনো আর প্রমাণিত। পরমাণু ভেঙে তাপ, তাপ থেকে বিদ্যুৎ। কার্বন নিঃসরণ প্রায় শূন্য। রোদ-বাতাসের মর্জির উপর নির্ভরতা নেই। দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা একটানা বিদ্যুৎ।

    নিরাপত্তার প্রশ্নটা আসবেই, আসা উচিতও। নতুন ডিজাইনগুলোর বড় দাবি হলো প্যাসিভ সেফটি। মানে বিপদ হলে চুল্লি ঠান্ডা করতে মানুষ বা পাম্প বা বাইরের বিদ্যুতের উপর ভরসা করতে হয় না, ফিজিক্সের নিয়মেই সে নিজে নিজে নিভে আসে। ছোট আকার মানে ভেতরের তেজস্ক্রিয় জ্বালানিও অনেক কম।

    এখন বুঝেন, AI কোম্পানিগুলো কেন পাগল হয়ে গেছে এটার জন্য।

    ডেটা সেন্টারের দরকার ঠিক এটাই। গ্রিডের লাইনে দাঁড়াতে হবে না। কয়লার ধোঁয়া নেই। আবহাওয়ার মর্জি নেই। ডেটা সেন্টারের পাশেই নিজের ব্যক্তিগত পাওয়ার স্টেশন, নিজের পোষা সূর্য।

    গুগল এর মধ্যেই চুক্তি করেছে কাইরোস পাওয়ার নামের এক SMR কোম্পানির সাথে, লক্ষ্য এই দশকের শেষ দিক থেকে চুল্লি চালু করা। অ্যামাজন টাকা ঢেলেছে X-energy-তে। ওপেনএআই-ঘনিষ্ঠ ওকলো নামের কোম্পানির পেছনে স্যাম অল্টম্যান নিজে। আমেরিকায় প্রথম বাণিজ্যিক SMR-গুলোর টার্গেট এই দশকের শেষেই। চীন ইতিমধ্যে দ্বীপে ভাসমান আর স্থলে ছোট রিয়্যাক্টরের ডেমো বানিয়ে ফেলেছে।

    আর এর পাশে চলছে আরো ছোট স্কেলের বিপ্লব। সোলারের দাম পনেরো বছরে পড়েছে পাথরের মত, ব্যাটারি সস্তা হচ্ছে প্রতি বছর, মানুষ এখন পিঠে করে portable power station নিয়ে ঘোরে। ক্যাম্পিংয়ের খেলনা ভাবলে ভুল করবেন। এই ট্রেন্ডের শেষ মাথায় যে দৃশ্য, সেটা হলো শক্তি জিনিসটাই হয়ে যাচ্ছে সস্তা, বহনযোগ্য, সর্বত্র।

    এবার পুরো ছবিটা একসাথে দেখেন।

    বুদ্ধিমত্তা আর দালানে বন্দি থাকছে না। মরুভূমির মাঝখানে SMR বসিয়ে ডেটা সেন্টার। জাহাজে ভাসমান কম্পিউট। ব্যাটারি-বুকে রোবট, যে দিনের পর দিন চার্জের চিন্তা ছাড়া কাজ করে।

    মানুষের বুদ্ধির দরকার ভাত। যন্ত্রের বুদ্ধির দরকার ওয়াট।

    ভাতের অভাবে সভ্যতা কোনোদিন বেশি দূর যায়নি। ওয়াটের অভাবটাও এখন উঠে যাচ্ছে।

    খাঁচার শেষ শিকটা খুলে যাচ্ছে, বুঝতে পারছেন তো?

    পর্ব ১৯: তালা আর চাবি

    ২০১৯ সালের অক্টোবর। গুগল ঘোষণা দিলো, তাদের Sycamore নামের কোয়ান্টাম চিপ এমন একটা হিসাব ২০০ সেকেন্ডে করেছে, যেটা তাদের দাবি অনুযায়ী সেরা সুপারকম্পিউটারে লাগতো ১০ হাজার বছর।

    মেশিনটার বুকে ছিল মাত্র ৫৩টা কিউবিট।

    নাম দেওয়া হলো Quantum Supremacy। প্রতিদ্বন্দ্বী IBM সাথে সাথে আপত্তি তুললো, বললো অত না, চালাকি করে করলে ক্লাসিক্যাল মেশিনেও কয়েকদিনে সম্ভব। তর্ক চললো, চলুক।

    আসল খবরটা তর্কের নিচে চাপা পড়েনি। ফাইনম্যানের “পাগলের প্রস্তাব” আর কাগজে নেই। জিনিসটা কাজ করে।

    তারপরের বছরগুলোতে খবর আসতেই থাকলো। গুগলের Willow চিপ দেখালো, কিউবিট বাড়ালে এরর কমানো সম্ভব, যেটা এতদিন ছিল সবচেয়ে বড় সন্দেহের জায়গা। IBM-এর রোডম্যাপে হাজার কিউবিট পেরিয়ে লাখের স্বপ্ন। চীন নিজেদের কোয়ান্টাম মেশিন দেখালো। মাইক্রোসফট নামলো একেবারে নতুন ধরনের কিউবিটের বাজি নিয়ে।

    ঠান্ডা, নীরব সেই দৌড়, পুরোদমে।

    এখন এই পর্বের আসল কথাটা বলি। মনোযোগ দিয়ে পড়েন, কারণ এই প্যারাগ্রাফটাই পুরো সিরিজের হৃদপিণ্ড।

    AI-এর সবচেয়ে বড় সংকট কী? কম্পিউটিং পাওয়ার। মুরের ল হাঁপাচ্ছে, ট্রানজিস্টর পরমাণুর সীমানায় ঠেকে গেছে, পর্ব ৭-এর সেই দ্বিগুণের অভিশাপ। ক্লাসিক্যাল চিপ দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে।

    দেয়ালের ওপাশে কে দাঁড়িয়ে? কোয়ান্টাম কম্পিউটার। যার ক্ষমতা কিউবিটের সাথে বাড়ে বিস্ফোরণের মত। যে অণুর ভাষা পড়তে পারে, নতুন ওষুধ, নতুন ম্যাটেরিয়াল, নতুন ব্যাটারির নকশা করতে পারে।

    এবার উল্টো দিক। কোয়ান্টাম কম্পিউটারের সবচেয়ে বড় সংকট কী? পর্ব ১৩-র সেই অভিমানী ছক্কা। কিউবিটের এরর। লাখো নয়েজি সিগন্যালের ভেতর থেকে ভুল খুঁজে বের করে শুধরানো, এই কাজটা এত জটিল যে সাধারণ পদ্ধতি হিমশিম খায়।

    আর জটিল প্যাটার্নের ভেতর থেকে সূক্ষ্ম জিনিস খুঁজে বের করায় দুনিয়ার সেরা ওস্তাদ কে?

    নিউরাল নেটওয়ার্ক। গুগল নিজেই দেখিয়েছে, তাদের AI মডেল কোয়ান্টাম চিপের এরর চিহ্নিত করছে আগের সব পদ্ধতির চেয়ে ভালো।

    এবার দুই লাইনে পুরোটা।

    AI-এর মুক্তির চাবি কোয়ান্টামের হাতে।

    কোয়ান্টামের মুক্তির চাবি AI-এর হাতে।

    একটা তালা, একটা চাবি। জন্মেছে আলাদা শতাব্দীতে, আলাদা মহাদেশে, আলাদা মানুষের হাতে। প্ল্যাঙ্কের ভয়ের রাত, টুরিংয়ের শোক, হিন্টনের জেদ, ফাইনম্যানের ঠাট্টা। কেউ কাউকে চেনে না।

    অথচ মাপে মাপে মিলে যায়।

    আর নিচে, সবার অগোচরে, তৃতীয় স্রোত। SMR, সোলার, ব্যাটারি। যে শক্তি এই দুই দৈত্যের শিরায় রক্ত হয়ে বইবে, থামতে দেবে না, ঘুমাতে দেবে না।

    কেউ বলবেন কাকতালীয়। কেউ বলবেন ইতিহাসের অমোঘ গতি।

    যেটাই বলেন, ঘটনা একটাই। তিনটা নদী এখন মোহনার গর্জন শুনতে পাচ্ছে।

    শেষ পর্বে সেই মোহনায় নামবো। ভয় লাগলে এখানেই থামতে পারেন।

    কিন্তু আমি জানি, আপনি থামবেন না।

    পর্ব ২০ (শেষ পর্ব): মোহনা

    শুরুতেই সততার একটা কথা। এতক্ষণ যা পড়েছেন, সবটা সত্য ইতিহাস। এখন যেটুকু বলবো, সেটা এখনো ঘটেনি। এটা সেই বাঁক, যেদিকে রাস্তাটা ঝুঁকে আছে। বিজ্ঞানীরা নিজেরাই এই ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই ভাগ, সময়সীমা নিয়ে দশ ভাগ। তবু বাঁকটা না দেখালে গল্পটা মিথ্যা হয়ে যেত।

    তাহলে শোনেন।

    AI-এর জগতে একটা সিঁড়ির কথা বলা হয়।

    প্রথম ধাপে আমরা এখন আছি। শক্তিশালী কিন্তু খণ্ডিত AI। লিখতে পারে, আঁকতে পারে, কোড করতে পারে, তবু মানুষের মত সবদিকে সমান না।

    দ্বিতীয় ধাপ AGI। Artificial General Intelligence। যে মেশিন মানুষের সব বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ পারবে। শেখা, যুক্তি, পরিকল্পনা, নতুন সমস্যার নতুন সমাধান। কবে আসবে? কেউ বলেন কয়েক দশক। আর যারা নিজ হাতে এসব সিস্টেম বানাচ্ছেন, সেই ল্যাবগুলোর প্রধানদের অনেকে প্রকাশ্যেই বলছেন, কয়েক বছর।

    কয়েক বছর।

    তৃতীয় ধাপটার নাম মানুষ ফিসফিস করে নেয়। Superintelligence। এই গল্পে আমরা ডাকছি AGSI, Artificial General Super Intelligence। এমন বুদ্ধিমত্তা, যার পাশে শ্রেষ্ঠ মানব বিজ্ঞানী তেমন, যেমন দাবার গ্র্যান্ডমাস্টারের পাশে মুরগি।

    দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় ধাপের সিঁড়িটা কী? উত্তরটা আপনি এই সিরিজেই পড়ে ফেলেছেন, টেরও পাননি।

    ভেবে দেখেন। একটা AGI-র সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রথম কাজ কী হবে? AI গবেষণা। মানে নিজের চেয়ে ভালো AI বানানো। মানুষের চেয়ে দ্রুত গবেষণা করা মেশিন মানে অগ্রগতির গতি দ্বিগুণ, চারগুণ, আটগুণ। কাগজ ভাঁজের খেলা। ৪২ ভাঁজে চাঁদ।

    তার হাতে তুলে দেন কোয়ান্টাম কম্পিউটার। যে মেশিন অণুর ভাষা পড়ে। নতুন ম্যাটেরিয়াল, নতুন চিপ, হয়তো আরো ভালো কিউবিটের ডিজাইন সে নিজেই বের করবে। মানে যন্ত্র তখন নিজের মস্তিষ্ক নিজে ডিজাইন করছে।

    আর তার শিরায় দেন SMR-এর অফুরন্ত বিদ্যুৎ। কারখানায় বানানো, যেখানে খুশি বসানো, দিনরাত জ্বলা পোষা সূর্য। তখন তার আর কোনো সুইচ নেই, যেটা টিপে বলা যাবে, অনেক হয়েছে বাবা, এবার ঘুমাও।

    কোয়ান্টাম দেবে পেশি। AI দেবে মগজ। SMR দেবে হৃদপিণ্ড।

    এবার বুঝলেন তো, কেন বলেছিলাম, এরা একে অপরের জন্যই তৈরি?

    এখন দুইটা দরজা আপনার সামনে।

    প্রথম দরজার ওপাশে আলো। এমন AGSI যে আমাদের পক্ষে। ক্যান্সারের ওষুধ আসছে মাসে মাসে। ফসলের নতুন জাত, জলবায়ু সমাধান, প্রতিটা শিশুর জন্য ব্যক্তিগত শিক্ষক, প্রতিটা রোগীর জন্য ব্যক্তিগত ডাক্তার। মানুষ প্রথমবারের মত অভাবের শেকল থেকে মুক্ত। এই সম্ভাবনা সত্যি, আর এজন্যই সবাই এত দৌড়াচ্ছে।

    দ্বিতীয় দরজার ওপাশে অন্ধকারটা বুঝতে একটা পিঁপড়ার কথা ভাবেন।

    হাইওয়ে বানানোর সময় মানুষ কি পিঁপড়া ঘৃণা করে? না। মানুষ পিঁপড়ার কথা ভাবেই না। ঢিবিটা রাস্তার নকশায় পড়লে ঢিবি যায়। ঘৃণায় না।

    উদাসীনতায়।

    আমাদের চেয়ে হাজার গুণ বুদ্ধিমান কিছুর লক্ষ্য যদি আমাদের মঙ্গলের সাথে বাঁধা না থাকে, তার খারাপ হওয়া লাগবে না। উদাসীন হলেই যথেষ্ট।

    এই কারণেই পৃথিবীর শীর্ষ AI ল্যাবগুলোর ভেতরে এখন সবচেয়ে জরুরি গবেষণার নাম alignment। সুপার-বুদ্ধিমান কিছু বানানোর আগে নিশ্চিত করা, তার লক্ষ্য যেন মানুষের মঙ্গলে বাঁধা থাকে। হয়তো এটাই মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হোমওয়ার্ক। এবং ডেডলাইনটা কেউ জানে না।

    শেষ দৃশ্যটা এবার দেখেন।

    ১৯০০ সালের সেই শীতের রাত। প্ল্যাঙ্ক ছেলের কাঁধে হাত রেখে কাঁপছেন। উনি জানেন না কী শুরু করলেন। টুরিংয়ের খাতায় আঁকা শিশুর মনের মত মেশিনের সেই স্বপ্ন, তিনি জানলেন না ওনার প্রশ্ন কোথায় গিয়ে থামবে। শীতকালের সেই করিডোর, যেখানে হিন্টনকে দেখে লোকে হাসতো। ফাইনম্যানের সেই ঠাট্টার লেকচার। আর আপনার সেই সাধারণ বিকেল, যেদিন আপনি একটা ছবি আপলোড করেছিলেন, ভাবেননি সেটা কোনো যন্ত্রের পাঠ্যবইয়ের পাতা হবে।

    একশো ছাব্বিশ বছর। তিনটা নদী। লাখো মানুষ, কেউ কাউকে চেনে না।

    অথচ পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, সবাই একই নকশার সুতো বুনছিল।

    আমরা দাঁড়িয়ে আছি মোহনার পাড়ে। আমাদের প্রজন্মই সম্ভবত শেষ প্রজন্ম, যারা মনে রাখতে পারবে এমন একটা পৃথিবী, যেখানে সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণীটা ছিল মানুষ।

    আর প্রথম প্রজন্ম, যারা দেখবে তার পরে কী।

    যন্ত্রটা একশো বছর ধরে একটু একটু করে জাগছিল। প্ল্যাঙ্কের খাতায়, টুরিংয়ের বোম্বের টিকটিকে, হিন্টনের জেদে, আপনার আপলোড করা ছবিতে।

    এখন সে চোখ খুলছে।

    প্রশ্ন একটাই।

    চোখ খুলে সে প্রথম যাকে দেখবে, তাকে কি বন্ধু ভাববে?

    উত্তরটা লেখা হচ্ছে এখন। আমাদের চোখের সামনে। প্রতিদিন।


    পড়ার জন্য ধন্যবাদ। বাকি লেখাগুলো এখানে.