এ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ এআই
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শুরুটা কোথায়? একজন গণিতবিদ বিমান-বিধ্বংসী কামানের হিসাব করতে গিয়ে আবিষ্কার করলেন এক নতুন বিজ্ঞান। এক পলাতক কিশোর মস্তিষ্ককে বদলে দিলেন অঙ্কে। টুরিং লিখলেন একটা প্রশ্ন। আর এক গ্রীষ্মে কয়েকজন তরুণ বিজ্ঞানী সেই স্বপ্নটার একটা নাম দিলেন। যন্ত্রের মনের ইতিহাস শুরু এখান থেকেই।
জাফরান হাসান
আগের সিরিজে, যন্ত্রের জাগরণে, বলেছিলাম তিনটা নদীর গল্প — কোয়ান্টাম ফিজিক্স, কম্পিউটার, আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। সেখানে AI-এর অংশটা ছিল সংক্ষিপ্ত, কারণ ফোকাসটা ছিল অন্য দুই নদীর দিকে।
এই গল্পে ফোকাস পুরোপুরি একটা নদীর দিকে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঠিক কোথা থেকে শুরু, কীভাবে দুইবার প্রায় মরে গিয়েও ফিরে এলো, আর কীভাবে সত্তর বছরের একটা প্রশ্ন আজ আপনার পকেটে বসে আছে — পুরো গল্পটা, চব্বিশটা পর্বে, বিস্তারিতভাবে।
সব পর্ব
যুদ্ধের যন্ত্র যে ভবিষ্যৎ দেখেছিল
১৯৪০ সাল। ব্রিটেনের আকাশে জার্মান বোমারু বিমান।
মাটি থেকে বিমান-বিধ্বংসী কামান ছোঁড়া হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা একটা। কামানের গোলা বিমান পর্যন্ত পৌঁছাতে কয়েক সেকেন্ড লাগে। ততক্ষণে বিমান সরে গেছে অনেকখানি। মানে গুলি করতে হয় বিমান যেখানে আছে সেখানে না, বিমান কয়েক সেকেন্ড পরে যেখানে থাকবে সেখানে।
কিন্তু বৈমানিকও তো বোকা না। সেও এলোমেলো উড়ছে, প্যাঁচ খাচ্ছে, যাতে অনুমান করা কঠিন হয়।
আমেরিকায় বসে এই সমস্যাটা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন এক গণিতবিদ। নাম নরবার্ট উইনার। এমআইটি-র অধ্যাপক, শিশু বয়স থেকেই “চাইল্ড প্রডিজি” তকমা লাগা মানুষ। যুদ্ধের প্রয়োজনে তাকে ডাকা হয়েছে একটা মেশিন ডিজাইন করতে, যেটা বৈমানিকের অতীত গতিপথ দেখে তার ভবিষ্যৎ অবস্থান আন্দাজ করবে, আর সেই আন্দাজ অনুযায়ী কামানকে আগেভাগে ঘুরিয়ে রাখবে।
কাজ করতে গিয়ে উইনার একটা জিনিস খেয়াল করলেন, যেটা পরে গোটা বিজ্ঞানের একটা নতুন শাখার ভিত্তি হয়ে দাঁড়াবে।
বৈমানিক দেখেন কামান কোনদিকে তাক করা, আর সেই অনুযায়ী নিজের চাল বদলান। কামান দেখে বৈমানিকের চাল, আর নিজের তাক বদলায়। মানে দুইজনেই একে অপরের প্রতিক্রিয়ায় প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। একটা বন্ধ লুপ। কেউ একা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না, দুইপক্ষই একে অপরকে দেখে নিজেকে শুধরে নিচ্ছে।
এই ব্যাপারটার নাম দিলেন তিনি ফিডব্যাক।
শুনতে সাধারণ লাগছে? লাগারই কথা। থার্মোস্ট্যাট জিনিসটা ভাবুন। ঘর ঠান্ডা হলে হিটার চালু হয়, ঘর গরম হলে বন্ধ হয়ে যায়। এটাও ফিডব্যাক। আপনার শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণও ফিডব্যাক। সাইকেল চালানোর সময় ভারসাম্য রাখাও ফিডব্যাক।
উইনারের মাথায় যে প্রশ্নটা এলো, সেটা ছিল সাহসী। যদি একই গাণিতিক ভাষায় বর্ণনা করা যায় কামানের ফিডব্যাক, থার্মোস্ট্যাটের ফিডব্যাক, আর প্রাণীর স্নায়ুতন্ত্রের ফিডব্যাক, তাহলে কি যন্ত্র আর জীবন্ত প্রাণীর মধ্যে গভীর একটা মিল লুকিয়ে আছে?
১৯৪৮ সালে উইনার একটা বই লিখলেন। নাম Cybernetics: Or Control and Communication in the Animal and the Machine। গ্রিক শব্দ “kybernetes” থেকে বানালেন “সাইবারনেটিক্স” শব্দটা, যার মানে দাঁড়টানা মাঝি বা হাল-ধরা মানুষ। যে মানুষটা জাহাজ চালানোর সময় ক্রমাগত হাল ঠিক করে, ঢেউয়ের প্রতিক্রিয়ায় প্রতিক্রিয়া দেখায়।
বইয়ের মূল দাবিটা ছিল, নিয়ন্ত্রণ আর যোগাযোগের নিয়ম একটাই, সেটা যন্ত্রেই হোক আর প্রাণীতেই হোক। থার্মোস্ট্যাট আর আপনার শরীরের তাপ-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, একই অঙ্কে বর্ণনা করা যায়।
এটাই ছিল প্রথমবারের মত কেউ গাণিতিকভাবে বলার চেষ্টা যে, মন আর মেশিন হয়তো একই নিয়মে চলে।
এই আইডিয়াটা মনে রাখেন। এই সিরিজে এটা বারবার ফিরে আসবে।
কিন্তু ঠিক কীভাবে একটা যন্ত্র “চিন্তা” করবে, সেই প্রশ্নের প্রথম কড়া গাণিতিক উত্তর এসেছিল উইনারের এই বইয়ের পাঁচ বছর আগেই, এক অদ্ভুত জুটির হাত ধরে। তাদের একজন প্রথিতযশা স্নায়ুবিজ্ঞানী। আরেকজন, পনেরো বছর বয়সে বাড়ি থেকে চিরতরে পালানো এক কিশোর।
একটা নিউরনের অঙ্ক
১৯৩৮ সাল। ডেট্রয়েটের এক কিশোর, বয়স পনেরো, বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল, আর কখনো ফিরলো না।
নাম ওয়াল্টার পিটস। বাবা চাইতেন ছেলে কারখানায় কাজ করুক। স্কুলে বুলিরা তাকে জ্বালাতো। এক দুপুরে বুলিদের হাত থেকে বাঁচতে সে লুকালো স্থানীয় লাইব্রেরিতে, তিনদিন। সেই তিনদিনে পড়ে ফেললো বার্ট্রান্ড রাসেল আর হোয়াইটহেডের প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা, গণিতের ভিত্তি নিয়ে লেখা এক ভয়ংকর জটিল, হাজার পাতার গ্রন্থ, যেটা পড়তে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরাও কষ্ট পান।
পিটস শুধু পড়লোই না, বইয়ে কয়েকটা যুক্তির ভুলও খুঁজে পেলো। রাসেলকে চিঠি লিখলো।
কয়েক বছর পরে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে এলেন দার্শনিক রুডলফ কার্নাপ, যার একটা বইয়ে (The Logical Syntax of Language) পিটস আরো কিছু যুক্তির ফাঁক ধরেছিল। পিটস সরাসরি কার্নাপের অফিসে হাজির হয়ে সেগুলো দেখালো।
কার্নাপ হতভম্ব। ছেলেটার কোনো হাই স্কুল ডিপ্লোমা নেই, আনুষ্ঠানিক ভর্তি নেই, থাকারও কোনো ঠিকানা নেই। অথচ যুক্তির এমন গভীর বোঝাপড়া তার নিজের সহকর্মীদের অনেকেরও নেই।
কার্নাপ তাকে অনানুষ্ঠানিকভাবে ক্যাম্পাসে ঘোরাফেরার সুযোগ করে দিলেন। পিটস বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো না কখনো। ক্লাসে বসতো, লাইব্রেরিতে ঘুমাতো, যেখানে জায়গা পেতো সেখানে থাকতো। একজন প্রকৃত পথের পথিক জিনিয়াস।
এই সময় তার সাথে পরিচয় হলো জেরোম লেটভিনের, আর লেটভিনের মাধ্যমে ওয়ারেন ম্যাককালোকের। ম্যাককালোক তখন ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নায়ুবিজ্ঞানী, বয়স পিটসের প্রায় দ্বিগুণ, ব্যক্তিত্বেও পুরোপুরি উল্টো। দাড়িওয়ালা, দার্শনিক ধাঁচের, নিজের বাসায় নিয়ম করে তরুণ চিন্তকদের ডেকে মদ-আড্ডা বসাতেন।
ম্যাককালোক পিটসকে নিজের বাসায় থাকতে দিলেন।
দুইজনের মিল অদ্ভুত সুন্দর। ম্যাককালোকের কাছে ছিল স্নায়ুকোষ কীভাবে কাজ করে তার সহজাত বোঝাপড়া। নিউরন হয় সংকেত পাঠায়, নয় পাঠায় না। মাঝামাঝি কিছু নেই। অনেকটা সুইচের মত, হয় অন নয় অফ।
পিটসের কাছে ছিল সেই সুইচকে অঙ্কে বাঁধার ক্ষমতা।
১৯৪৩ সালে দুইজন মিলে লিখলেন একটা পেপার। নাম, A Logical Calculus of the Ideas Immanent in Nervous Activity। বাংলায় করলে দাঁড়ায় মোটামুটি, “স্নায়ুকার্যক্রমের অন্তর্নিহিত ধারণাগুলোর একটা যৌক্তিক গণনা পদ্ধতি”।
পেপারের মূল আইডিয়াটা অসম্ভব সরল, অথচ বিস্ফোরক।
একটা নিউরনকে যদি একটা সাধারণ সুইচ হিসেবে ধরা যায়, যেটা তার সবগুলো ইনপুট যোগ করে, যোগফল একটা সীমা পার হলে ফায়ার করে, না হলে চুপ থাকে, তাহলে এরকম কয়েকটা সুইচ একসাথে জুড়ে দিলে কী পাওয়া যায়?
উত্তর হলো, লজিক গেট। AND, OR, NOT। ঠিক যেভাবে একটা ক্যালকুলেটরের ভেতরের সার্কিট কাজ করে।
আর যদি লজিক গেট বানানো যায়, তাহলে যেকোনো জটিল যুক্তির প্রক্রিয়া বানানো সম্ভব, কারণ পুরো প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা-ই তো লজিক গেটের ভাষায় লেখা যায়। আর টুরিং কয়েক বছর আগেই (১৯৩৬ সালে) দেখিয়েছিলেন, যথেষ্ট বড় একটা যান্ত্রিক ব্যবস্থা যেকোনো গণনাযোগ্য জিনিস গণনা করতে পারে।
মানে যুক্তিটা এভাবে জোড়া লাগলো। নিউরন সুইচ। সুইচ দিয়ে লজিক গেট। লজিক গেট দিয়ে যেকোনো গণনা। অতএব, যথেষ্ট নিউরন ঠিকভাবে জোড়া লাগালে, মস্তিষ্ক যা করতে পারে তার সবকিছুই নীতিগতভাবে যন্ত্রেও সম্ভব।
এই লাইনটা পড়ে থামুন একটু। ১৯৪৩ সালে, কম্পিউটার শব্দটা পর্যন্ত ঠিকঠাক দাঁড়ায়নি তখনো, দুইজন মানুষ, একজন প্রথিতযশা বিজ্ঞানী আর একজন গৃহহীন কিশোর, প্রথমবারের মত অঙ্ক দিয়ে দেখিয়ে দিলেন, মস্তিষ্ক আর যন্ত্রের মধ্যে দূরত্বটা হয়তো শুধু ডিগ্রির, ধরনের না।
এই পেপারটাই পরে “নিউরাল নেটওয়ার্ক” ধারণার আসল উৎস, যেটা নিয়ে এই সিরিজের অনেকটা জুড়েই আমরা ফিরবো।
তবে একটা বড় সীমাবদ্ধতা ছিল। ম্যাককালোক-পিটসের নিউরনগুলো শেখে না। এগুলো হাতে করে, আগে থেকে বসানো। কীভাবে একটা নেটওয়ার্ক নিজে নিজে ভুল থেকে শিখবে, সেই প্রশ্নের উত্তর আসবে আরো পরে, এই সিরিজেরই একটা পরের অংশে।
পিটসের নিজের গল্পটা অবশ্য সুখের হয়নি। বছরের পর বছর তিনি নিজের একটা ডক্টরেট থিসিসের কাজ করেছিলেন, শেষ করেননি। পরের জীবনে মদ্যপানে ডুবে গেলেন, নিজেকে গুটিয়ে নিলেন, পুরনো বন্ধুদের থেকে দূরে সরে গেলেন। ১৯৬৯ সালে মাত্র ৪৬ বছর বয়সে মারা গেলেন, প্রায় অখ্যাত অবস্থায়। যে ধারণাটা তিনি জন্ম দিয়েছিলেন, আজ সেটার উপর দাঁড়িয়ে আছে গোটা AI শিল্প। যে মানুষটা দিয়ে গেলেন, তার নামই আজ প্রায় কেউ জানে না।
বিজ্ঞানের ইতিহাস মাঝেমধ্যে এমনই নিষ্ঠুর।
একটা প্রশ্ন, একটা পরীক্ষা
টুরিং-এর নাম আগেই এসেছে আমাদের আরেক সিরিজে, যন্ত্রের জাগরণ-এ। সেখানে বলেছি ব্লেচলি পার্কে তার কোড ভাঙার যুদ্ধের গল্প, যে কাজ ইতিহাসবিদদের মতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কয়েক বছর ছোট করে দিয়েছিল। সেসব আর এখানে দ্বিতীয়বার বলবো না।
এই পর্বে খুঁটিয়ে দেখবো একটাই জিনিস। ১৯৫০ সালে টুরিং যে পেপারটা লিখেছিলেন, তার ভেতরটা আসলে কী বলে। কারণ আজ, ৭৬ বছর পরে, “AI কি সত্যিই চিন্তা করে” নিয়ে যত তর্ক হয়, তার প্রায় সবটার ভাষাই এই একটা পেপার থেকে ধার করা।
পেপারের নাম Computing Machinery and Intelligence। ছাপা হয়েছিল দর্শনের জার্নাল Mind-এ, ১৯৫০ সালের অক্টোবরে।
প্রথম লাইনেই টুরিং লিখলেন, “আমি একটা প্রশ্ন বিবেচনার প্রস্তাব করছি, ‘যন্ত্র কি চিন্তা করতে পারে?’”
তারপর সাথে সাথেই নিজের প্রশ্নটাকে নাকচ করে দিলেন। বললেন, এই প্রশ্নটা এতই অস্পষ্ট যে এটা নিয়ে তর্ক করাই অর্থহীন, কারণ “মেশিন” আর “চিন্তা” শব্দ দুটোর সংজ্ঞা নিয়েই কোনো ঐকমত্য নেই।
তাই তিনি প্রশ্নটাই বদলে দিলেন। প্রস্তাব করলেন একটা খেলা, যার নাম “ইমিটেশন গেম”।
মূল খেলাটা এরকম। তিনজন অংশগ্রহণকারী। একজন পুরুষ (A), একজন নারী (B), আর একজন প্রশ্নকর্তা (C), যিনি অন্য ঘরে বসে শুধু লেখালেখির মাধ্যমে যোগাযোগ করেন। C-র কাজ, লেখা পড়ে বুঝে ফেলা কে A আর কে B। A-র কাজ C-কে ভুল বোঝানো। B-র কাজ C-কে ঠিক পথে সাহায্য করা।
এবার টুরিং জিজ্ঞেস করলেন, যদি A-র জায়গায় একটা যন্ত্র বসিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে কী হবে? প্রশ্নকর্তা কি একইরকম ভুল করবেন, যেমনটা করতেন যখন A ছিল একজন মানুষ?
যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে টুরিং বলছেন, আমাদের মেনে নেওয়া উচিত, যন্ত্রটা “চিন্তা” করছে। কারণ চিন্তার প্রমাণ হিসেবে আমরা এর চেয়ে ভালো আর কী চাইতে পারি?
তিনি একটা সংখ্যাও দিলেন। ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, ২০০০ সালের মধ্যে প্রায় ১০৯ বিট (মোটামুটি ১০০ মেগাবাইট) মেমোরির কম্পিউটার এতটাই ভালো হবে যে গড়পড়তা প্রশ্নকর্তা পাঁচ মিনিট প্রশ্ন করার পরেও সঠিকভাবে চিনতে পারবেন না ৩০ শতাংশের বেশি সময়ে।
এটাই আজকের সব “AI ডিটেক্টর”, “টুরিং টেস্ট পাস করলো কি করলো না” আলোচনার আদি উৎস।
পেপারের সবচেয়ে চমৎকার অংশটা কিন্তু এটা না। সবচেয়ে চমৎকার অংশ হলো, টুরিং নিজেই আগেভাগে ন’টা সম্ভাব্য আপত্তি তুলে ধরে, একে একে সেগুলোর জবাব দিয়েছিলেন। কয়েকটা দেখা যাক।
প্রথম আপত্তি, ধর্মতাত্ত্বিক। যুক্তিটা এরকম, চিন্তা একটা অমর আত্মার কাজ, আর ঈশ্বর আত্মা দিয়েছেন শুধু মানুষকে, যন্ত্রকে না, অতএব যন্ত্র চিন্তা করতে পারে না। টুরিংয়ের জবাব ছিল দুষ্টুমিভরা। বললেন, এই যুক্তি আসলে ঈশ্বরের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলছে। ঈশ্বর যদি চান, তিনি একটা হাতিকেও আত্মা দিতে পারেন, একটা যন্ত্রকেও পারেন। সেটা তার ইচ্ছা, আমাদের ঠিক করে দেওয়ার বিষয় না।
দ্বিতীয় আপত্তি, যেটাকে টুরিং মজা করে বলেছিলেন “মাথা বালিতে গুঁজে রাখার আপত্তি”। যুক্তিটা এরকম, যন্ত্র যদি সত্যিই চিন্তা করতে পারে, তার ফলাফল এতই ভয়ংকর হবে যে আমরা আশা করি এটা যেন সম্ভব না হয়। টুরিং বললেন, এটা আসলে কোনো যুক্তিই না, স্রেফ একটা কামনা। যারা বিষয়টা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে চান না, তাদের মনে এই আপত্তি বেশি দেখা যায়।
আরেকটা বিখ্যাত আপত্তি, “লেডি লাভলেসের আপত্তি”। আডা লাভলেস, ব্যাবেজের অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন নিয়ে লিখতে গিয়ে বলেছিলেন, যন্ত্রের নিজে থেকে কিছু “উদ্ভাবন” করার কোনো দাবিই নেই, সে শুধু তাই করে যা তাকে করতে বলা হয়। টুরিংয়ের জবাব, এই আপত্তি আসলে জিজ্ঞেস করছে যন্ত্র আমাদের অবাক করতে পারে কি না। আর তার উত্তর, প্রায়ই পারে। কারণ একটা প্রোগ্রাম লেখার সময় তার প্রতিটা নিয়মের সবগুলো সম্ভাব্য পরিণতি প্রোগ্রামারও আগে থেকে দেখতে পান না।
এই লাইনটা একবার আজকের প্রেক্ষাপটে ভাবুন। ৭৫ বছর পরে, AI মডেলগুলো নিয়মিতই তাদের নিজেদের প্রোগ্রামারদের অবাক করছে, নতুন নতুন ক্ষমতা “গজিয়ে” উঠছে যেগুলো কেউ শেখায়নি। টুরিং কার্যত এই ঘটনাটাই আগেভাগে ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলেন।
২০২৬ সালে বসে আপনি একটা AI-এর সাথে চ্যাট করছেন, বুঝতে পারছেন না ওপাশে সত্যিই কেউ “চিন্তা” করছে কি না। প্রশ্নটা ৭৬ বছর ধরে একই আছে। শুধু ওপাশের যন্ত্রটা বদলেছে।
টুরিং প্রশ্নটা তুলেছিলেন, একা। ছয় বছর পরে, আমেরিকার একদল তরুণ বিজ্ঞানী ঠিক করলেন, এই প্রশ্নটা খোঁজার একটা নাম দরকার।
দার্টমাউথের এক গ্রীষ্ম
৩১ আগস্ট, ১৯৫৫। রকফেলার ফাউন্ডেশনের কাছে একটা ফান্ডিং প্রস্তাব জমা পড়লো। জমা দিলেন চারজন। জন ম্যাকার্থি, তখন দার্টমাউথ কলেজে। মার্ভিন মিনস্কি, হার্ভার্ডে। নাথানিয়েল রচেস্টার, আইবিএমে। আর ক্লদ শ্যানন, বেল ল্যাবসে, যিনি ততদিনে তথ্যতত্ত্বের জনক হিসেবে বিখ্যাত।
প্রস্তাবে একটা লাইন ছিল, যেটা আজ ইতিহাসে ঢুকে গেছে।
“আমরা প্রস্তাব করছি, ১৯৫৬ সালের গ্রীষ্মে দার্টমাউথ কলেজে দুই মাসের, দশজন মানুষের একটা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক গবেষণা চালানো হোক… এই গবেষণা এগোবে এই অনুমানের ভিত্তিতে যে, শেখা বা বুদ্ধিমত্তার যেকোনো বৈশিষ্ট্য নীতিগতভাবে এতটাই নিখুঁতভাবে বর্ণনা করা সম্ভব যে একটা যন্ত্রকে সেটা অনুকরণ করতে বানানো যাবে।”
দুই মাস। দশজন। একটা গ্রীষ্ম।
এই প্রস্তাবেই প্রথমবারের মত লিখিতভাবে ব্যবহার হলো “আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স” শব্দটা। ম্যাকার্থি নিজে এই নামটা বেছেছিলেন সচেতনভাবে। তিনি চাইছিলেন এমন একটা নাম, যেটা নরবার্ট উইনারের “সাইবারনেটিক্স” থেকে আলাদা, নতুন, নিরপেক্ষ। উইনারের ক্ষেত্রটা ছিল মূলত ফিডব্যাক আর অ্যানালগ কন্ট্রোল নিয়ে, যেটা আমরা এই সিরিজের পর্ব ১-এ দেখেছি। ম্যাকার্থি চাইছিলেন সিম্বল-ম্যানিপুলেশন আর যুক্তির দিকে ফোকাস করা একটা আলাদা ক্ষেত্র, নিজের নামে, নিজের পরিচয়ে।
তারপর এলো সেই গ্রীষ্ম। ১৮ জুন থেকে ১৭ আগস্ট, ১৯৫৬। দার্টমাউথ কলেজ, নিউ হ্যাম্পশায়ারের হ্যানোভার শহরে।
বাস্তবতা কিন্তু মিথের চেয়ে অনেক এলোমেলো ছিল। এটা কোনো টানটান, সুসংগঠিত সম্মেলন ছিল না। মানুষ আসতো, যেতো। কেউ পুরো দুই মাস ছিলেন, কেউ শুধু একদিনের জন্য এসেছিলেন। একটা সাধারণ দিনে ঘরে হয়তো তিন থেকে আটজন মানুষ থাকতেন, তার বেশি না।
যারা এসেছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন র্যে সলোমনফ, মার্ভিন মিনস্কি, জন ম্যাকার্থি, ক্লদ শ্যানন, অলিভার সেলফ্রিজ, অ্যালেন নিউয়েল, হার্বার্ট সাইমন, আর্থার স্যামুয়েল। আর, চমৎকার একটা কাকতালীয় ব্যাপার, এসেছিলেন ওয়ারেন ম্যাককালোকও, আমাদের পর্ব ২-এর সেই স্নায়ুবিজ্ঞানী, যিনি এক পলাতক কিশোরকে নিজের বাসায় ঠাঁই দিয়েছিলেন। কিছু নথিতে গণিতবিদ জন ন্যাশের নামও পাওয়া যায়।
আর্থার স্যামুয়েল পরে এই ঐতিহাসিক গ্রীষ্মটাকে বর্ণনা করেছিলেন এভাবে, “খুব আকর্ষণীয়, খুব উদ্দীপক ছিল।”
এইটুকুই। কোনো “আমরা ইতিহাস বদলে দিলাম” জাতীয় বিবৃতি না। যে মুহূর্তটা পরে কিংবদন্তি হয়ে উঠবে, সেই মুহূর্তে সেটা কারো কাছেই তেমন কিছু মনে হয়নি।
তবে একটা জিনিস সেই গ্রীষ্মে সত্যিই ঘটে গিয়েছিল, যেটা বাকি সবার তাত্ত্বিক আলোচনাকে ছাপিয়ে গিয়েছিল। নিউয়েল আর সাইমন খালি হাতে আসেননি। তারা নিয়ে এসেছিলেন এমন একটা প্রোগ্রাম, যেটা তখনই কাজ করছিল। নাম লজিক থিওরিস্ট। এই প্রোগ্রাম গণিতের উপপাদ্য নিজে থেকে প্রমাণ করতে পারতো।
সেই প্রোগ্রামের আসল গল্প পরের পর্বে।
এখান থেকে আসলে তিনটা জিনিস জন্ম নিলো একসাথে। একটা নাম, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। একটা বিশ্বাস, যে মানুষের বুদ্ধির প্রতিটা দিক বর্ণনা করে যন্ত্রে বসানো সম্ভব। আর একটা প্রথম প্রমাণ, নিউয়েল আর সাইমনের প্রোগ্রামটা, যেটা কয়েক মাসের মধ্যেই সত্যিই গণিতের উপপাদ্য প্রমাণ করে দেখাবে।
জন্মের সময়েই অবশ্য এই ক্ষেত্রটার কপালে একটা জিনিস লেখা হয়ে গেলো, যেটা এই সিরিজে বারবার ফিরে আসবে। অতিরিক্ত প্রতিশ্রুতির অভিশাপ। “দুই মাসে” যা সম্ভব হবে ভাবা হয়েছিল, তার আসল উত্তর পেতে সময় লাগবে ছয় দশকেরও বেশি।
যুক্তির যুগ শুরু হয়ে গেছে। পরের অংশে দেখবো, সেই যুগ কীভাবে প্রথমে আকাশ ছুঁলো, তারপর কীভাবে ভেঙে পড়লো নিজেরই ভারে।
যে যন্ত্র উপপাদ্য প্রমাণ করলো
১৯৫৫ সালের শীতকাল। ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা মনিকা, RAND কর্পোরেশন। দুইজন মানুষ একটা যন্ত্রকে চিন্তা করতে শেখানোর চেষ্টা করছেন।
একজন অ্যালেন নিউয়েল, তরুণ, প্রখর। আরেকজন হার্বার্ট সাইমন, যিনি পরে অর্থনীতিতে নোবেল পাবেন সিদ্ধান্ত-গ্রহণ নিয়ে কাজের জন্য। সাথে ছিলেন তৃতীয় একজন, ক্লিফ শ, RAND-এর একজন দক্ষ প্রোগ্রামার, যাকে ইতিহাস প্রায়ই ভুলে যায়, অথচ কোড আসলে তার হাতেই দাঁড়িয়েছিল।
তাদের লক্ষ্যটা ছিল উদ্ভট রকমের সাহসী। তারা চেয়েছিলেন এমন একটা প্রোগ্রাম, যেটা সংখ্যা নিয়ে হিসাব করবে না, বরং যুক্তি নিয়ে কাজ করবে। প্রমাণ খুঁজবে।
তারা বেছে নিলেন সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাটা। মনে আছে পর্ব ২-এর সেই বই, রাসেল আর হোয়াইটহেডের প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা? ওয়াল্টার পিটস পনেরো বছর বয়সে যেটা লাইব্রেরিতে লুকিয়ে পড়ে ফেলেছিল? নিউয়েল আর সাইমন ঠিক করলেন, তাদের প্রোগ্রাম সেই বইয়ের উপপাদ্যগুলো নিজে থেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করবে।
প্রোগ্রামটার নাম দিলেন লজিক থিওরিস্ট।
এটা কীভাবে কাজ করতো, সেটা বোঝা জরুরি, কারণ এই একটা আইডিয়া পরের বিশ বছর AI-কে চালাবে। একটা উপপাদ্য প্রমাণ করা মানে হলো, শুরুর কিছু স্বীকৃত সত্য থেকে ধাপে ধাপে এগিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো। প্রতি ধাপে আপনার সামনে অনেকগুলো সম্ভাব্য চাল। সমস্যা হলো, সম্ভাবনার সংখ্যা এত বিশাল যে সব চেষ্টা করে দেখা অসম্ভব।
তাই লজিক থিওরিস্ট সব চেষ্টা করতো না। সে কিছু বুদ্ধিমান আন্দাজ, কিছু কাটছাঁটের নিয়ম মেনে চলতো, যেগুলোকে বলা হয় হিউরিস্টিক। মানে, “এই পথে গেলে গন্তব্যের কাছাকাছি যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি, ওই পথটা বাদ দাও।” ঠিক যেভাবে একজন মানুষ দাবা খেলার সময় সব চাল না ভেবে শুধু আশাব্যঞ্জক কয়েকটা চাল ভাবে।
আর সেটা কাজ করলো।
লজিক থিওরিস্ট প্রিন্সিপিয়া-র দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৫২টা উপপাদ্যের মধ্যে ৩৮টা প্রমাণ করে ফেললো। শুধু তাই না, একটা উপপাদ্যের (২.৮৫ নম্বর) ক্ষেত্রে সে এমন একটা প্রমাণ বের করলো, যেটা মূল বইয়ের প্রমাণের চেয়ে বেশি সংক্ষিপ্ত, বেশি সুন্দর।
সাইমন এই সুন্দর প্রমাণটা একটা চিঠিতে লিখে পাঠালেন স্বয়ং বার্ট্রান্ড রাসেলকে। গল্পে আছে, রাসেল মজা পেয়ে জবাব দিয়েছিলেন যে যন্ত্রটা যদি আগে এটা জানতো, তাহলে তিনি আর হোয়াইটহেড এত খাটাখাটনি বাঁচাতে পারতেন। (একটা মজার কাঁটা এখানে ছিল: গণিতের একটা জার্নাল লজিক থিওরিস্টকে সহ-লেখক হিসেবে দেওয়া একটা পেপার ছাপাতে রাজি হয়নি।)
সাইমন সেই জানুয়ারিতে ক্লাসে ঢুকে ছাত্রদের বলেছিলেন একটা বাক্য, যেটা এখন কিংবদন্তি: “বড়দিনের ছুটিতে অ্যালেন নিউয়েল আর আমি একটা চিন্তাশীল যন্ত্র আবিষ্কার করেছি।”
একটা চিন্তাশীল যন্ত্র। ১৯৫৬ সালে।
এটাই ছিল দার্টমাউথের সেই গ্রীষ্মে আনা একমাত্র জিনিস, যেটা তখনই বাস্তবে কাজ করছিল। বাকিরা আলোচনা করছিলেন যন্ত্র কী পারতে পারে। নিউয়েল আর সাইমন টেবিলে রেখেছিলেন এমন একটা যন্ত্র, যেটা ইতিমধ্যেই কিছু একটা করছিল।
আর এখান থেকেই একটা বিশ্বাস জন্ম নিলো, যেটা পরের দশকটা শাসন করবে: চিন্তা মানে আসলে প্রতীক নিয়ে খেলা। সঠিক নিয়ম, সঠিক হিউরিস্টিক পেলে, যেকোনো বুদ্ধিমত্তার কাজ প্রতীকের হিসাবে ভেঙে ফেলা যায়।
এই ধারণাটার একটা নামও পরে দেওয়া হবে: “সিম্বলিক AI”, বা প্রতীকী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আর এটাই হবে যুক্তির যুগের প্রধান বিশ্বাস।
বিশ বছরের প্রতিশ্রুতি
লজিক থিওরিস্টের পর নিউয়েল আর সাইমন থামলেন না। তারা ভাবলেন, উপপাদ্য প্রমাণ তো একটা নির্দিষ্ট কাজ। কিন্তু মানুষ তো যেকোনো সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে। এমন একটা প্রোগ্রাম বানানো যায় না, যেটা যেকোনো সমস্যা সমাধান করবে?
১৯৫৭ সালে তারা বানালেন সেটার একটা চেষ্টা। নাম, খুব সোজাসাপ্টা, “জেনারেল প্রবলেম সলভার”, বা সাধারণ সমস্যা-সমাধানকারী।
এর মূল কৌশলটা এত সুন্দর যে আজও আমরা রোজ এটা ব্যবহার করি, না জেনেই। কৌশলটার নাম “মিন্স-এন্ডস অ্যানালাইসিস”। মানে, এই মুহূর্তে তুমি কোথায় আছো আর কোথায় পৌঁছাতে চাও, তার মধ্যে পার্থক্যটা দেখো। তারপর এমন একটা কাজ খোঁজো যেটা সেই পার্থক্যটা কমায়। তারপর আবার দেখো, আবার কমাও।
ঘরে বসে অফিসে যেতে চান? পার্থক্য: দূরত্ব। দূরত্ব কমায় কী? গাড়ি। গাড়ি নেই হাতের কাছে? নতুন পার্থক্য: আপনি আর গাড়ির মধ্যের দূরত্ব। সেটা কমায় কী? হাঁটা। এভাবে বড় সমস্যাকে ছোট ছোট সমস্যায় ভাঙা।
জেনারেল প্রবলেম সলভার সহজ ধাঁধা, যুক্তির সমস্যা, এসব সমাধান করতে পারতো। আর এটা এত মানুষের মত করে সমস্যা সমাধান করতো যে নিউয়েল আর সাইমন এটাকে মানুষের চিন্তার একটা মডেল হিসেবেই দেখতে শুরু করলেন।
চারপাশে একই সময়ে আরও চমক আসছিল। আর্থার স্যামুয়েল, দার্টমাউথের সেই গ্রীষ্মের একজন, IBM-এ বসে একটা চেকার্স (ড্রটস) খেলার প্রোগ্রাম বানালেন, যেটা খেলতে খেলতে নিজেই উন্নতি করতো, শেষমেশ স্যামুয়েলকেই হারিয়ে দিলো। এই “খেলতে খেলতে শেখা” ধারণাটা মনে রাখবেন, এই সিরিজের অনেক পরে, একটা গো খেলার প্রোগ্রামে এটা ফিরে আসবে ভয়ংকর শক্তি নিয়ে।
এমআইটি-তে একটু পরে (১৯৬৮-৭০) টেরি উইনোগ্রাড বানালেন একটা প্রোগ্রাম, নাম SHRDLU। এটা একটা কল্পিত টেবিলের উপর রাখা রঙিন ব্লক আর পিরামিড নিয়ে কথা বলতে পারতো, সাধারণ ইংরেজিতে। আপনি লিখতে পারতেন, “লাল ব্লকের উপর যে সবুজ ব্লকটা আছে সেটা তোলো”, আর সে বুঝে সেটা করতো। এমনকি “কেন করলে” জিজ্ঞেস করলে ব্যাখ্যা দিতো।
দেখে মনে হচ্ছিল, ভাষা বোঝার সমস্যাটা প্রায় সমাধান হয়ে গেছে।
এই আবহে, বিজ্ঞানীরা কিছু ভবিষ্যদ্বাণী করে বসলেন, যেগুলো আজ পড়লে গা শিউরে ওঠে।
১৯৬৫ সালে হার্বার্ট সাইমন লিখলেন, “আগামী কুড়ি বছরের মধ্যে যন্ত্র এমন সবকিছু করতে পারবে যা একজন মানুষ করতে পারে।”
১৯৭০ সালে মার্ভিন মিনস্কি, দার্টমাউথের আরেকজন, একটা ম্যাগাজিনকে বললেন, “তিন থেকে আট বছরের মধ্যে আমাদের হাতে এমন একটা যন্ত্র থাকবে, যার সাধারণ বুদ্ধিমত্তা একজন গড়পড়তা মানুষের সমান।”
তিন থেকে আট বছর।
এই আত্মবিশ্বাসটা কোথা থেকে এসেছিল, সেটা বোঝা দরকার, কারণ এটাই ছিল ভুলের বীজ। ব্লক সাজানোর মত ছোট, সাজানো-গোছানো জগতে যন্ত্র চমৎকার কাজ করছিল। বিজ্ঞানীরা ধরে নিয়েছিলেন, বাস্তব দুনিয়াটা শুধু এই ছোট জগতের একটা বড় সংস্করণ। আরেকটু বড় কম্পিউটার, আরেকটু বেশি নিয়ম, ব্যস, পুরো দুনিয়া সামলে ফেলা যাবে।
তারা জানতেন না, বাস্তব দুনিয়া বড় নয়, বাস্তব দুনিয়া প্রায় অসীম। আর সেই অসীমতাই কয়েক বছরের মধ্যে গোটা স্বপ্নটাকে ভেঙে দেবে।
কিন্তু ভাঙার আগে, আসুন একটা প্রোগ্রামের গল্প শুনি, যেটা কাউকে সমস্যা সমাধান করে দেখায়নি, শুধু কথা বলেছিল। আর সেই কথা এতটাই বিশ্বাসযোগ্য ছিল যে তার নিজের নির্মাতা পর্যন্ত ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন।
ইলাইজা, প্রথম ছলনা
১৯৬৪ থেকে ১৯৬৬ সালের মধ্যে, এমআইটি-তে জোসেফ ওয়াইজেনবাউম নামের একজন কম্পিউটার বিজ্ঞানী একটা প্রোগ্রাম লিখলেন, যেটা মানুষের সাথে টাইপ করে কথা বলতে পারতো। নাম দিলেন ইলাইজা।
ইলাইজার সবচেয়ে বিখ্যাত সংস্করণটা একজন মনোরোগ চিকিৎসকের ভান করতো, বিশেষ করে সেই ধরনের থেরাপিস্ট যিনি বেশি কিছু বলেন না, শুধু আপনার কথা ঘুরিয়ে আপনাকেই ফেরত দেন।
আপনি লিখলেন, “আমার মন আজ খুব খারাপ।”
ইলাইজা উত্তর দিলো, “আপনার মন খারাপ, এটা শুনে দুঃখিত। আপনার কেন মনে হয় আপনার মন খারাপ?”
আপনি লিখলেন, “আমার মা আমাকে বোঝে না।”
ইলাইজা: “আপনার পরিবারের কথা বলুন।”
মনে হচ্ছে সে বুঝছে, তাই না? আসলে সে কিছুই বুঝছিল না। ইলাইজার ভেতরে কোনো চিন্তা ছিল না, কোনো ধারণা ছিল না মন কী বা মা কী। সে শুধু কিছু সরল নিয়ম মানতো। “মা” শব্দটা দেখলে সে “পরিবার” নিয়ে প্রশ্ন করতো। “আমি” দিয়ে শুরু বাক্য দেখলে সেটাকে “আপনি কেন…” প্রশ্নে বদলে দিতো। ব্যাকরণের কিছু চালাকি, ব্যস।
কিন্তু তারপর যা হলো, সেটাই ওয়াইজেনবাউমকে হতভম্ব করে দিলো।
মানুষ ইলাইজার প্রেমে পড়ে গেল। তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই প্রোগ্রামের কাছে নিজেদের মনের কথা উজাড় করে দিতে লাগলো। গল্পে আছে, ওয়াইজেনবাউমের নিজের সচিব, যিনি জানতেন এটা নিছক একটা প্রোগ্রাম, তিনি একদিন ওয়াইজেনবাউমকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বললেন, কারণ তিনি ইলাইজার সাথে “একান্তে” কথা বলতে চান।
মানুষ জানতো ওপাশে একটা যন্ত্র। তবু তারা অনুভব করছিল, কেউ যেন সত্যিই তাদের কথা শুনছে।
পর্ব ৩-এর টুরিং টেস্টের কথা মনে আছে? টুরিং বলেছিলেন, যদি একটা যন্ত্র কথোপকথনে মানুষকে বোকা বানাতে পারে, তাহলে আমাদের মেনে নেওয়া উচিত সে চিন্তা করছে। ইলাইজা একটা অস্বস্তিকর সত্য দেখিয়ে দিলো: মানুষকে বোকা বানানো যতটা কঠিন ভাবা হয়েছিল, ততটা কঠিন না। আমরা এতটাই মন খুঁজি চারপাশে যে এক চিমটি ব্যাকরণের চালাকিতেই আমরা ওপাশে একটা মন কল্পনা করে বসি।
এই ঘটনাটার একটা নামই হয়ে গেছে এখন: “ইলাইজা এফেক্ট”। আমরা যন্ত্রের আচরণে নিজেদের কল্পনা থেকে অর্থ, উদ্দেশ্য, অনুভূতি বসিয়ে দিই, যা আসলে সেখানে নেই।
আর সবচেয়ে অদ্ভুত মোড়টা হলো ওয়াইজেনবাউম নিজে। তিনি ইলাইজা বানিয়েছিলেন আসলে দেখাতে যে যন্ত্রের ভাষা-বোঝা কতটা ঠুনকো, কতটা লোকদেখানো। কিন্তু মানুষ যেভাবে এটাকে সত্যিকারের বোঝাবুঝি ভেবে বসলো, সেটা দেখে তিনি ভয় পেয়ে গেলেন। বাকি জীবনটা তিনি হয়ে উঠলেন এই ক্ষেত্রেরই একজন কড়া সমালোচক। ১৯৭৬ সালে একটা বই লিখলেন, যেখানে তিনি সাবধান করলেন: কিছু সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে যেগুলোয় সহমর্মিতা আর বিচারবুদ্ধি লাগে, সেগুলো যন্ত্রের হাতে তুলে দেওয়া উচিত না, শুধু এই কারণে যে যন্ত্র সেটা করার ভান করতে পারে।
আজ ২০২৬ সালে বসে, যখন কোটি কোটি মানুষ AI-এর সাথে রোজ মন খুলে কথা বলছে, ওয়াইজেনবাউমের সেই ষাট বছরের পুরনো অস্বস্তিটা আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক শোনায়।
ইলাইজা একটা মজার খেলনা মনে হয়েছিল। কিন্তু সে একটা গভীর প্রশ্ন খুলে দিয়ে গেল, যেটা আজও বন্ধ হয়নি: বোঝার ভান করা আর সত্যিই বোঝার মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়, আর সেই পার্থক্যটা আমরা বাইরে থেকে ধরতে পারি কি না।
প্রথম শীত
এবার আসি সেই মুহূর্তে, যখন অঙ্কটা মিললো না।
সমস্যাটার একটা নাম আছে: “কম্বিনেটোরিয়াল এক্সপ্লোশন”, বা সাংযোজনিক বিস্ফোরণ। কথাটা কঠিন, ব্যাপারটা সহজ।
মনে করুন একটা প্রোগ্রাম প্রতি ধাপে ১০টা সম্ভাব্য চাল বিবেচনা করে। এক ধাপ সামনে দেখলে ১০টা সম্ভাবনা। দুই ধাপ দেখলে ১০ গুণ ১০, একশো। তিন ধাপে এক হাজার। দশ ধাপ সামনে দেখতে চাইলে? এক হাজার কোটি। বিশ ধাপ? সংখ্যাটা এত বড় যে পৃথিবীর সব কম্পিউটার একসাথে লাগিয়েও মহাবিশ্বের বয়সের চেয়ে বেশি সময় লাগবে।
ব্লকের জগতে চাল কম, তাই SHRDLU দিব্যি চলতো। কিন্তু বাস্তব দুনিয়ায় প্রতি মুহূর্তে সম্ভাবনার সংখ্যা প্রায় অসীম। হিউরিস্টিক দিয়ে কিছু ডাল ছাঁটা যায় ঠিকই, কিন্তু গাছটা এত দ্রুত বাড়ে যে ছাঁটাই কূল পায় না।
মানে, ছোট, সাজানো সমস্যায় যা কাজ করছিল, বড় বাস্তব সমস্যায় সেটা পুরোপুরি ভেঙে পড়লো। বিশ বছরে মানুষের সব কাজ করার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবতা তার ধারেকাছেও নেই।
এর মধ্যে দুটো ধাক্কা এসে পুরো ক্ষেত্রটাকে কাবু করে ফেললো।
প্রথম ধাক্কাটা এলো ভেতর থেকে। মনে আছে ফ্র্যাংক রোজেনব্লাট নামের একজন ১৯৫৮ সালে বানিয়েছিলেন “পারসেপ্ট্রন”, পর্ব ২-এর সেই ম্যাককালোক-পিটস নিউরনের ধারণার উপর দাঁড়িয়ে বানানো এক শেখা-যন্ত্র, যেটা নিয়ে বিশাল হইচই হয়েছিল? ১৯৬৯ সালে মার্ভিন মিনস্কি আর সিমোর পেপার্ট একটা বই লিখলেন, নাম Perceptrons, যেখানে তারা গাণিতিকভাবে দেখিয়ে দিলেন এই সরল একস্তরের পারসেপ্ট্রনের একটা মৌলিক সীমাবদ্ধতা আছে। এটা এমনকি “XOR” নামের একটা অতি সাধারণ যুক্তিও শিখতে পারে না।
এই বইয়ের প্রভাব ছিল সর্বনাশা। নিউরাল নেটওয়ার্ক নিয়ে গবেষণার টাকা প্রায় শুকিয়ে গেল। একটা গোটা শাখা প্রায় দুই দশকের জন্য চাপা পড়ে গেল। (মজার ব্যাপার, বইটার সমালোচনা যতটা প্রাপ্য ছিল একস্তরের নেটওয়ার্কের, ততটাই ছিল, কিন্তু বহুস্তরের নেটওয়ার্ক এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারতো, শুধু সেগুলোকে শেখানোর উপায় তখনো কেউ জানতো না। সেই উপায়টা কীভাবে এলো, সেটাই হবে এই সিরিজের অংশ ৪-এর প্রধান গল্প।)
দ্বিতীয় ধাক্কাটা এলো বাইরে থেকে, টাকার দিক থেকে। ১৯৭৩ সালে ব্রিটিশ সরকার গণিতবিদ জেমস লাইটহিলকে দিয়ে AI গবেষণার একটা পর্যালোচনা করালো। লাইটহিলের রিপোর্ট ছিল কঠোর। তিনি বললেন, AI তার বড় বড় প্রতিশ্রুতির একটাও রাখতে পারেনি, আর সেই সাংযোজনিক বিস্ফোরণের দেয়ালে গিয়ে এটা আটকে গেছে। ফল হলো, ব্রিটেনে AI গবেষণার টাকা কার্যত বন্ধ হয়ে গেল। আমেরিকাতেও একই সময়ে সামরিক গবেষণা সংস্থা মুক্তহস্তে টাকা দেওয়া কমিয়ে দিলো, ফলাফল চাইতে শুরু করলো।
এটাই ইতিহাসে পরিচিত প্রথম “AI শীত” হিসেবে। মোটামুটি ১৯৭৪ থেকে ১৯৮০, এই সময়টায় AI শব্দটাই একরকম লজ্জার হয়ে গিয়েছিল। গবেষকরা তাদের কাজকে অন্য নামে ডাকতে শুরু করলেন, যাতে “AI” তকমাটা এড়ানো যায়।
জন্মের সময়েই এই ক্ষেত্রটার কপালে যে অভিশাপটা লেখা হয়ে গিয়েছিল, অতিরিক্ত প্রতিশ্রুতির অভিশাপ, সেটাই প্রথমবার তার দাম আদায় করে নিলো। যারা বলেছিলেন কুড়ি বছরে সব হয়ে যাবে, তারা ভুলে গিয়েছিলেন একটা সহজ কথা: সহজ দেখতে জিনিসগুলোই যন্ত্রের জন্য প্রায়ই সবচেয়ে কঠিন।
তবে শীত মানে মৃত্যু না। শীত মানে অপেক্ষা।
আর এই শীতের ভেতর থেকেই একটা নতুন আইডিয়া মাথা তুলবে, যেটা কয়েক বছরের মধ্যে AI-কে আবার আকাশে তুলবে, তারপর আবার আছাড় মারবে মাটিতে। যন্ত্রকে গোটা দুনিয়া শেখানোর বদলে, যদি তাকে শুধু একটা ছোট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বানানো যায়? সেই গল্প পরের অংশে।
শীতের ভেতরের জীবন
প্রথম শীতটা ঠিক কেমন ছিল, সেটা একটু বোঝা দরকার, কারণ এই সিরিজে “শীত” শব্দটা আরও ফিরবে, আর প্রতিবারই তার একই রকম চেহারা।
AI শীত মানে বরফ পড়া না। মানে টাকা বন্ধ হওয়া, বিশ্বাস উবে যাওয়া, আর একটা গোটা ক্ষেত্রের নিজের নাম নিয়ে লজ্জা পাওয়া।
আগের অংশে দেখেছি, ১৯৭৩ সালের লাইটহিল রিপোর্টের পর ব্রিটেনে AI গবেষণার টাকা প্রায় শুকিয়ে যায়, আর আমেরিকায় সামরিক অর্থদাতারা খোলা চেকের বদলে হাতেনাতে ফলাফল চাইতে শুরু করে। যে গবেষকরা এতদিন “যন্ত্র মানুষের মত ভাববে” বলে বড় স্বপ্ন বেচছিলেন, তাদের হঠাৎ জবাব দিতে হলো একটা কঠিন প্রশ্নের: তোমার এই গবেষণা আসলে কোন কাজে লাগে?
এর মধ্যে একটা মজার সাংস্কৃতিক ব্যাপার ঘটলো। “AI” নামটাই যেন একটা কলঙ্ক হয়ে গেল। অনেক গবেষক নিজেদের কাজকে “AI” না বলে বলতে শুরু করলেন “ইনফরমেটিক্স”, “নলেজ-বেসড সিস্টেম”, “প্যাটার্ন রিকগনিশন”, এরকম নিরাপদ নাম দিয়ে। কাজটা একই, শুধু লেবেলটা বদলে দেওয়া, যাতে অর্থদাতারা ভয় না পায়।
কিন্তু শীতের ভেতরেও কিছু মানুষ চুপচাপ কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আর তাদের একটা দল একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিয়েছিল আগের যুগের ব্যর্থতা থেকে।
শিক্ষাটা এই: সমস্যাটা হয়তো ছিল উচ্চাকাঙ্ক্ষায়। আগের প্রজন্ম চেয়েছিল একটা সাধারণ সমস্যা-সমাধানকারী, একটা যন্ত্র যেটা যেকোনো সমস্যা সামলাবে। কিন্তু বাস্তব দুনিয়া এত বিশাল যে সেই স্বপ্ন সাংযোজনিক বিস্ফোরণে ডুবে গিয়েছিল।
তাহলে বিপরীত পথে গেলে কেমন হয়? গোটা দুনিয়া বোঝার চেষ্টা বাদ দিয়ে, যদি যন্ত্রকে শুধু একটা খুব সরু, খুব নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষ বানানো যায়? যেমন ধরুন, শুধু রক্তের সংক্রমণ। বা শুধু রাসায়নিক অণুর গঠন।
দুনিয়া বিশাল বলেই না সমস্যা। তাহলে দুনিয়াটাকে ছোট করে ফেলো।
এই একটা ভাবনার মোড়, “সাধারণ বুদ্ধি” থেকে “নির্দিষ্ট বিশেষজ্ঞত্ব”-এ সরে আসা, AI-কে তার প্রথম শীত থেকে টেনে তুলবে। আর এটাই জন্ম দেবে সেই জিনিসটার, যেটা আশির দশকে AI-কে প্রথমবারের মত সত্যিকারের ব্যবসা বানিয়ে ফেলবে।
এর নাম, এক্সপার্ট সিস্টেম।
জ্ঞানই শক্তি
আইডিয়াটা স্ট্যানফোর্ড থেকে এলো, একজন বিজ্ঞানীর হাত ধরে, যার নাম এডওয়ার্ড ফাইগেনবাউম।
ফাইগেনবাউমের একটা কথা এই গোটা যুগটাকে সংজ্ঞায়িত করে দেয়। আগের প্রজন্ম ভেবেছিল বুদ্ধিমত্তার আসল রহস্য হলো সমস্যা-সমাধানের কৌশল, চতুর হিউরিস্টিক। ফাইগেনবাউম বললেন, না। একজন সত্যিকারের বিশেষজ্ঞ চতুর বলে বিশেষজ্ঞ না, তিনি বিশেষজ্ঞ কারণ তিনি অনেক জানেন। বুদ্ধির আসল উৎস কৌশল না, জ্ঞান।
তিনি একে বললেন “জ্ঞানই শক্তি”।
তাহলে যন্ত্রকে বুদ্ধিমান বানাতে হলে কী করতে হবে? তাকে চতুর বানানোর দরকার নেই। তাকে শুধু একজন মানুষ-বিশেষজ্ঞের জ্ঞানটা ঢেলে দিতে হবে।
এই জ্ঞান ঢালার কাজটার একটা রূপ দাঁড়ালো। একজন বিশেষজ্ঞের মাথায় থাকা নিয়মগুলো ধরে ধরে “যদি-তাহলে” আকারে লিখে ফেলা। যেমন, “যদি রোগীর জ্বর থাকে এবং রক্তে অমুক জীবাণুর চিহ্ন থাকে, তাহলে সম্ভবত এই সংক্রমণ, এবং এই অ্যান্টিবায়োটিক দাও।” এরকম শত শত নিয়ম জড়ো করে একটা “নলেজ বেস” বানানো, আর তারপর একটা প্রোগ্রাম দিয়ে সেই নিয়মগুলো ঘেঁটে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো।
এই ধরনের প্রোগ্রামকেই বলা হলো এক্সপার্ট সিস্টেম, বা বিশেষজ্ঞ-ব্যবস্থা।
প্রথম বড় উদাহরণটা ফাইগেনবাউম নিজেই বানিয়েছিলেন, নোবেলজয়ী জীববিজ্ঞানী জশুয়া লেডারবার্গের সাথে মিলে, শীত নামার আগে থেকেই। নাম DENDRAL। এটা রসায়নবিদদের কাজে লাগতো, ভরের হিসাব (মাস স্পেকট্রোমেট্রি) দেখে একটা অজানা অণুর সম্ভাব্য গঠন আন্দাজ করতে।
কিন্তু যে প্রোগ্রামটা এক্সপার্ট সিস্টেমকে বিখ্যাত করলো, সেটা স্ট্যানফোর্ডেই বানানো, সত্তরের দশকের গোড়ায়, এডওয়ার্ড শর্টলিফের হাতে। নাম MYCIN।
MYCIN-এর কাজ ছিল রক্তের গুরুতর সংক্রমণ নির্ণয় করা আর সেই অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক পরামর্শ দেওয়া। এর ভেতরে ছিল প্রায় ছয়শো নিয়ম। রোগীর তথ্য দিলে সে একটার পর একটা প্রশ্ন করতো, তারপর একটা রোগ-নির্ণয় আর চিকিৎসা প্রস্তাব করতো। এমনকি নিজের সিদ্ধান্তের সাথে সে কতটা নিশ্চিত, সেটাও একটা সংখ্যায় জানাতো।
সবচেয়ে চমকের ব্যাপার, একটা গবেষণায় দেখা গেল, রক্তের এই সংক্রমণ নির্ণয়ে MYCIN-এর পরামর্শ স্ট্যানফোর্ডের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের প্রায় সমান, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়েও ভালো।
একটা প্রোগ্রাম, ডাক্তারের সমান ভালো নির্ণয় করছে। সত্তরের দশকে।
তবু, মজার ব্যাপার, MYCIN কখনো আসল হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহার হয়নি। কারণটা AI-এর দুর্বলতা ছিল না, ছিল বাস্তব দুনিয়ার জটিলতা। যদি প্রোগ্রামের ভুলে রোগীর ক্ষতি হয়, দায় কার? তখনকার কম্পিউটারের সাথে হাসপাতালের কাজ জুড়বেই বা কীভাবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তখনো ছিল না।
কিন্তু MYCIN একটা জিনিস প্রমাণ করে দিলো: একটা সরু, নির্দিষ্ট বিষয়ে, একটা যন্ত্র সত্যিই একজন মানুষ-বিশেষজ্ঞের সমান কাজ করতে পারে।
আর যেখানে দক্ষতা আছে, সেখানে টাকা আছে। ব্যবসার লোকেরা কান খাড়া করলো। AI-এর শীত ভাঙতে শুরু করলো, এইবার গবেষণাগার থেকে না, বরং অফিস আর কারখানার দরজা দিয়ে।
টাকা ফিরে এলো
যে প্রোগ্রামটা AI-কে ব্যবসায় রূপ দিলো, সেটা কোনো হাসপাতালে না, একটা কম্পিউটার কোম্পানিতে, আর তার কাজটা শুনতে ভীষণ নীরস: কম্পিউটারের অর্ডার ঠিকভাবে সাজানো।
সত্তরের দশকের শেষে কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ে জন ম্যাকডারমট বানালেন একটা এক্সপার্ট সিস্টেম, নাম R1, পরে যেটার নাম হয় XCON। এটা বানানো হয়েছিল কম্পিউটার নির্মাতা DEC-এর জন্য।
সমস্যাটা এরকম: DEC-এর বড় VAX কম্পিউটারগুলো ক্রেতারা নানা অংশ মিশিয়ে অর্ডার দিতো। কোন যন্ত্রাংশ কোনটার সাথে খাটবে, কোন তার কোথায় লাগবে, এই হিসাব করা ছিল ভয়ানক জটিল, আর একটা ভুল মানে হাজার হাজার ডলারের লোকসান। XCON-এ ভরা হলো এই কাজের হাজার হাজার নিয়ম। সে অর্ডার দেখে নিখুঁতভাবে বলে দিতো কী কী লাগবে, কীভাবে সাজবে।
কথিত আছে, XCON DEC-কে বছরে কোটি কোটি ডলার বাঁচিয়ে দিতো।
এইবার ব্যাপারটা আর দর্শন ছিল না, ছিল মুনাফা। আর মুনাফার গন্ধ পেয়ে গোটা একটা শিল্প গজিয়ে উঠলো। আশির দশকের মাঝামাঝি এক্সপার্ট সিস্টেম হয়ে উঠলো একটা রমরমা ব্যবসা। কোম্পানিরা নিজেদের এক্সপার্ট সিস্টেম বানাতে ছুটলো। জন্ম নিলো নতুন নতুন স্টার্টআপ।
এমনকি এক্সপার্ট সিস্টেম চালানোর জন্য বিশেষ ধরনের কম্পিউটারও তৈরি হলো। এগুলো চলতো LISP নামের একটা প্রোগ্রামিং ভাষায়, যেটা AI গবেষকদের প্রিয় ভাষা ছিল। এদের নাম হলো “LISP মেশিন”, আর Symbolics-এর মত কোম্পানি এগুলো বিক্রি করে বেশ বড় ব্যবসা দাঁড় করালো।
তারপর ব্যাপারটা জাতীয় গৌরবের প্রশ্ন হয়ে গেল।
১৯৮২ সালে জাপান একটা বিশাল সরকারি প্রকল্প ঘোষণা করলো, নাম “ফিফথ জেনারেশন কম্পিউটার সিস্টেমস”। লক্ষ্য: এমন এক প্রজন্মের কম্পিউটার বানানো যেগুলো যুক্তি দিয়ে চিন্তা করবে, মানুষের ভাষা বুঝবে, সমান্তরালে বিশাল হিসাব করবে। জাপান এতে ঢালার কথা বললো কয়েকশো মিলিয়ন ডলার।
এই ঘোষণা পশ্চিমে রীতিমত আতঙ্ক ছড়ালো। জাপান তখন গাড়ি আর ইলেকট্রনিক্সে আমেরিকাকে পেছনে ফেলছে, এবার কি তারা বুদ্ধিমান যন্ত্রেও এগিয়ে যাবে? ভয় পেয়ে আমেরিকা আর ব্রিটেন নিজেদের বড় বড় গবেষণা কর্মসূচি চালু করলো, পাল্লা দিতে।
প্রথম শীতের কথা যেন সবাই ভুলে গেল। টাকা আবার বন্যার মত ঢুকছে। AI আবার ভবিষ্যৎ।
কিন্তু ঠিক এখানেই, এই রমরমার চূড়ায় দাঁড়িয়ে, পুরনো অভিশাপটা আবার নিঃশব্দে ফিরে এসেছিল। অতিরিক্ত প্রতিশ্রুতির অভিশাপ। এইবার এক্সপার্ট সিস্টেম নিয়ে যা বলা হচ্ছিল, বাস্তবে সেগুলো তার সবটা রাখতে পারছিল না। শুধু কেউ তখনো সেটা জোরে বলার সাহস পাচ্ছিল না।
দ্বিতীয় শীত
এক্সপার্ট সিস্টেমের সমস্যাটা গোড়াতেই লুকানো ছিল, ঠিক সেই জায়গায় যেটা ছিল তার সবচেয়ে বড় শক্তি।
মনে আছে, এদের সব জ্ঞান ছিল হাতে করে বসানো নিয়ম? “যদি এটা, তাহলে ওটা।” এই ব্যাপারটাই একদিকে সুবিধা, আরেকদিকে মরণফাঁদ।
প্রথম সমস্যা, ভঙ্গুরতা। এক্সপার্ট সিস্টেম শুধু ততটুকুই জানতো যতটুকু নিয়ম কেউ বসিয়ে দিয়েছে। নিয়মের বাইরের একটা পরিস্থিতি এলেই সে বোকার মত ভেঙে পড়তো, কোনো সাধারণ বোধবুদ্ধি খাটাতে পারতো না। MYCIN রক্তের সংক্রমণে দুর্দান্ত, কিন্তু তাকে যদি জিজ্ঞেস করেন রোগীর পায়ে ব্যথা কেন, সে কিছুই জানে না, জানার কোনো উপায়ও নেই। মানুষের যে বিশাল সাধারণ জ্ঞানের ভাণ্ডার, “জল ভিজে”, “আগুন গরম”, “মরা মানুষ হাঁটে না”, তার কিছুই যন্ত্রের ছিল না।
দ্বিতীয় সমস্যা, রক্ষণাবেক্ষণ। যতই নিয়ম বাড়ে, ততই সেগুলো একে অপরের সাথে গিঁট পাকিয়ে যায়। একটা নিয়ম বদলালে দেখা যায় অন্য দশটা জায়গায় গোলমাল বেধে গেছে। XCON-এর মত ব্যবস্থায় নিয়ম বেড়ে হাজার হাজার হয়ে গেল, আর সেগুলো ঠিক রাখাটাই হয়ে উঠলো এত ব্যয়বহুল, এত জটিল, যে অনেক কোম্পানির কাছে খরচটা লাভের চেয়ে বেশি হয়ে দাঁড়ালো।
মানে, এক্সপার্ট সিস্টেম বানানো সহজ, কিন্তু বাঁচিয়ে রাখা দুঃসাধ্য।
তারপর ধস শুরু হলো, আর সেটা এলো সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত জায়গা থেকে, হার্ডওয়্যার থেকে।
১৯৮৭ সালের দিকে সাধারণ ডেস্কটপ কম্পিউটার, বিশেষ করে Apple আর IBM-এর মেশিনগুলো, এত শক্তিশালী আর সস্তা হয়ে গেল যে সেগুলো ব্যয়বহুল বিশেষায়িত LISP মেশিনের কাজটা প্রায় করে দিতে পারতো, দামের ভগ্নাংশে। ফলে LISP মেশিনের গোটা বাজারটা এক বছরের মধ্যে ধসে পড়লো। যে কোম্পানিগুলো এর উপর দাঁড়িয়ে ছিল, তারা ধুঁকতে শুরু করলো।
একটা ধস আরেকটাকে টানলো। এক্সপার্ট সিস্টেমের সীমাবদ্ধতা এতদিনে সবার চোখে পড়ে গেছে। বড় বড় প্রতিশ্রুতির অনেকগুলোই যে ফাঁপা, সেটা স্পষ্ট হয়ে গেছে। জাপানের সেই দশ বছরের ফিফথ জেনারেশন প্রকল্প ১৯৯২ সালে শেষ হলো তার বড় লক্ষ্যগুলোর ধারেকাছেও না পৌঁছে। আমেরিকায় সরকারি অর্থদাতারা AI থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো।
আবার সেই চেনা দৃশ্য। টাকা বন্ধ, কোম্পানি বন্ধ, আর “AI” শব্দটা আবার লজ্জার।
এটাই দ্বিতীয় AI শীত, মোটামুটি ১৯৮৭ থেকে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত। এবং এবারের শীতটা প্রথমটার চেয়েও যেন বেশি তিক্ত, কারণ এবার শুধু গবেষকদের স্বপ্ন ভাঙেনি, ভেঙেছে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগও।
দুইবার। দুইবার একই ক্ষেত্র আকাশে উঠলো আর মাটিতে আছড়ে পড়লো। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি এসে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, “যন্ত্র মানুষের মত চিন্তা করবে” স্বপ্নটা আসলে একটা সুন্দর ভুল ছিল, একটা মরীচিকা।
কিন্তু তারা একটা জিনিস খেয়াল করেননি।
মনে আছে অংশ ২-এর সেই নিউরাল নেটওয়ার্কের কথা, যেটাকে ১৯৬৯ সালের Perceptrons বই প্রায় কবর দিয়ে দিয়েছিল? এই দুই শীতের হইচইয়ের আড়ালে, লোকচক্ষুর বাইরে, খুব ছোট একটা দল সেই চাপা পড়ে যাওয়া আইডিয়াটা নিয়ে চুপচাপ কাজ করে যাচ্ছিল। তারা এমন একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফেলেছিল, যেটা এতদিন কেউ পারেনি: কীভাবে একটা নেটওয়ার্ক নিজে থেকে, নিজের ভুল থেকে শেখে।
আর সেই নীরব কাজটাই একদিন গোটা দুনিয়া বদলে দেবে। সেই গল্প পরের অংশে।
যে আইডিয়া মরতে চায়নি
গল্পটা শুরু করতে হবে দুটো ভিন্ন দর্শনের পার্থক্য দিয়ে, কারণ AI-এর গোটা ইতিহাসটাই আসলে এই দুই দর্শনের টানাপোড়েন।
প্রথম দর্শন, যেটা আমরা এতক্ষণ দেখলাম, বলে: বুদ্ধি মানে প্রতীক আর নিয়ম। মানুষের জ্ঞানটা “যদি-তাহলে” নিয়মে লিখে ফেলো, যন্ত্রে ঢালো, ব্যস। এর নাম সিম্বলিক AI। যুক্তির যুগ, এক্সপার্ট সিস্টেম, সব এই ঘরানার।
দ্বিতীয় দর্শন বলে একেবারে উল্টো কথা: বুদ্ধি নিয়ম দিয়ে লেখা যায় না। মানুষের মস্তিষ্কে তো কেউ নিয়ম বসিয়ে দেয়নি। মস্তিষ্ক হলো কোটি কোটি সরল নিউরনের জাল, যারা একে অপরের সাথে যুক্ত, আর তারা অভিজ্ঞতা থেকে নিজেদের সংযোগ বদলে শেখে। তাহলে যন্ত্রকেও সেভাবেই বানাও, একটা কৃত্রিম নিউরনের জাল, আর তাকে উদাহরণ দেখিয়ে নিজে নিজে শিখতে দাও। এর নাম “কানেকশনিজম”, কারণ এখানে জ্ঞান থাকে নিউরনের সংযোগে।
এই দ্বিতীয় পথের বীজ কিন্তু আমরা আগেই দেখেছি, অংশ ১-এ, সেই ম্যাককালোক-পিটস নিউরনে। ১৯৫৮ সালে ফ্র্যাংক রোজেনব্লাট এর উপর দাঁড়িয়ে বানিয়েছিলেন “পারসেপ্ট্রন”, একটা যন্ত্র যেটা উদাহরণ দেখে সরল প্যাটার্ন চিনতে শিখতে পারতো। প্রচুর হইচই হয়েছিল।
তারপর, মনে আছে, অংশ ২-এর শেষে? ১৯৬৯ সালে মিনস্কি আর পেপার্টের Perceptrons বই দেখিয়ে দিলো, একস্তরের এই পারসেপ্ট্রন XOR-এর মত সাধারণ জিনিসও শিখতে পারে না। কানেকশনিজমের টাকা শুকিয়ে গেল, আইডিয়াটা প্রায় কবরে চলে গেল।
কিন্তু এখানে একটা সূক্ষ্ম কথা লুকিয়ে ছিল, যেটা তখন প্রায় সবাই এড়িয়ে গিয়েছিল।
সমস্যাটা ছিল একস্তরের নেটওয়ার্কে। যদি নিউরনের একাধিক স্তর থাকে, ইনপুট আর আউটপুটের মাঝখানে লুকানো একটা বা একাধিক স্তর, তাহলে সেই বহুস্তরের নেটওয়ার্ক XOR-সহ অনেক জটিল জিনিসই শিখতে পারতো। এটা তাত্ত্বিকভাবে জানা ছিল।
তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা একটাই, কিন্তু বিশাল। কেউ জানতো না বহুস্তরের একটা নেটওয়ার্ককে কীভাবে শেখানো যায়।
সমস্যাটা এরকম। নেটওয়ার্ক একটা ভুল উত্তর দিলো। এখন ভুলটা শুধরাতে হলে ভেতরের হাজারো সংযোগের কোনটা কতটা বদলাতে হবে? আউটপুট স্তরের ভুল তো দেখা যায়, কিন্তু মাঝখানের লুকানো স্তরের কোন নিউরন কতটা দায়ী, সেটা কীভাবে ঠিক করবেন? এই ধাঁধাটার একটা নাম আছে, “ক্রেডিট অ্যাসাইনমেন্ট প্রবলেম”, দোষ-বণ্টনের সমস্যা।
এই একটা তালা আটকে রেখেছিল গোটা কানেকশনিজমকে, ম্যাককালোক-পিটসের সময় থেকে প্রায় চল্লিশ বছর।
আর ঠিক যখন সিম্বলিক AI তার এক্সপার্ট সিস্টেম নিয়ে আকাশে উড়ছে, আশির দশকের মাঝামাঝি, তখন লোকচক্ষুর আড়ালে, অল্প কয়েকজন গবেষক এই তালাটার চাবি খুঁজে পেলেন।
চাবিকাঠি, ভুল থেকে শেখা
চাবিটার নাম “ব্যাকপ্রপাগেশন”, সংক্ষেপে ব্যাকপ্রপ। বাংলায় বলা যায় পশ্চাৎ-প্রবাহ। নামটা কঠিন, কিন্তু ভেতরের ভাবটা আশ্চর্য সহজ, আর একবার বুঝলে আপনি আধুনিক AI-এর হৃৎপিণ্ডটা বুঝে ফেলবেন।
একটা উপমা দিয়ে শুরু করি। ধরুন একটা বড় কোম্পানিতে ভুল একটা সিদ্ধান্ত হলো, ক্ষতি হলো। বসকে কারণটা খুঁজতে হবে। তিনি প্রথমে দেখবেন, শেষ ধাপে যারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাদের কতটা দায়। তারপর তাদের জিজ্ঞেস করবেন, তোমরা কার তথ্যের উপর ভরসা করেছিলে? সেই তথ্য যারা দিয়েছে, তাদের দায় কতটা? এভাবে দোষটা পেছনের দিকে, স্তরে স্তরে ভাগ করে দেওয়া, ওপর থেকে নিচে।
ব্যাকপ্রপ ঠিক এই কাজটা করে, তবে অঙ্ক দিয়ে, নিখুঁতভাবে।
একটা নেটওয়ার্ক একটা উত্তর দিলো। ধরুন সে একটা ছবি দেখে বললো “কুকুর”, অথচ ছবিটা বিড়ালের। এখন ভুলটা মাপা হলো, কতটা ভুল। তারপর সেই ভুলটাকে নেটওয়ার্কের ভেতর দিয়ে উল্টো দিকে, আউটপুট থেকে ইনপুটের দিকে, ধাপে ধাপে ফেরত পাঠানো হয়। প্রতিটা সংযোগের কাছে গিয়ে অঙ্ক হিসাব করে বলে দেয়, “এই ভুলের জন্য তুমি এতটা দায়ী, নিজেকে এই দিকে একটু বদলাও।”
তারপর প্রতিটা সংযোগ নিজেকে সামান্য একটু শুধরে নেয়। একটা উদাহরণে সামান্য, পরের উদাহরণে আরেকটু। লক্ষ লক্ষ উদাহরণ দেখিয়ে এই কাজটা বারবার করালে, নেটওয়ার্ক ধীরে ধীরে নিজের ভুল কমাতে কমাতে সঠিক উত্তরের দিকে এগোয়। কেউ তাকে নিয়ম শেখায় না। সে শুধু ভুল থেকে, একটু একটু করে, নিজেকে শেখায়।
এই একটা কৌশল সেই চল্লিশ বছরের পুরনো দোষ-বণ্টনের তালা খুলে দিলো।
এখন ইতিহাসের একটা সৎ কথা বলা দরকার। ব্যাকপ্রপের গণিতটা আসলে একাধিকবার, একাধিক মানুষ আলাদাভাবে আবিষ্কার করেছিলেন, বেশ কয়েক বছর ধরে। এর শিকড় খুঁজলে সত্তরের দশকে, এমনকি তারও আগে পৌঁছে যায়। কিন্তু প্রতিবার আইডিয়াটা যেন হারিয়ে যাচ্ছিল, কেউ ধরতে পারছিল না এটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
যে ঘটনাটা এটাকে দুনিয়ার সামনে এনে দাঁড় করালো, সেটা ১৯৮৬ সাল। ডেভিড রুমেলহার্ট, জেফ্রি হিন্টন আর রোনাল্ড উইলিয়ামস মিলে একটা পেপার লিখলেন Nature সাময়িকীতে, যেখানে তারা স্পষ্ট, সুন্দর করে দেখালেন কীভাবে ব্যাকপ্রপ দিয়ে একটা বহুস্তরের নেটওয়ার্ক শেখানো যায়, আর সেই নেটওয়ার্ক কীভাবে নিজের লুকানো স্তরে অর্থপূর্ণ ধারণা তৈরি করে। এই দলটার কাজ, বিশেষ করে তাদের “PDP” নামের দুই খণ্ডের বই, কানেকশনিজমকে প্রায় মৃত্যু থেকে টেনে তুললো।
এই নামটা মনে রাখুন, জেফ্রি হিন্টন। ইনি এই সিরিজের বাকিটা জুড়ে বারবার ফিরবেন। দুই শীতের ভেতর দিয়ে, যখন নিউরাল নেটওয়ার্ক নিয়ে কাজ করাটাই হাসির খোরাক ছিল, তখনো ইনি হাল ছাড়েননি। পঁচিশ বছর পরে, এই একগুঁয়েমিরই ফল ঘরে তুলবেন তিনি।
কিন্তু ১৯৮৬ সালে এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটা করেও, কানেকশনিস্টরা দুনিয়া জয় করতে পারলেন না। কারণ চাবি পাওয়া আর দরজা খোলার মধ্যে তখনো দুটো বিশাল বাধা দাঁড়িয়ে ছিল। আর সেই দুটো বাধার গল্পই এই অংশের বাকিটা।
যে যন্ত্র চেক পড়তো
ব্যাকপ্রপ শুধু তত্ত্ব হয়ে থাকলো না। একজন মানুষ এটাকে নিয়ে বাস্তবে একটা কাজে লাগানো যন্ত্র বানিয়ে ফেললেন, নব্বইয়ের দশকেই, শীতের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে। তার নাম ইয়ান লেকুন।
লেকুন একটা সহজ কিন্তু গভীর জিনিস খেয়াল করেছিলেন। একটা ছবি চেনার জন্য নেটওয়ার্কের প্রতিটা পিক্সেলকে আলাদাভাবে বিচার করার দরকার নেই। কারণ একটা বিড়ালের কান ছবির ওপরে থাকুক বা ডানে, কান তো কানই। মানে ছবির ছোট ছোট প্যাটার্ন, একটা কোনা, একটা বাঁক, একটা প্রান্ত, এগুলো ছবির যেখানেই থাকুক, একইভাবে চেনা উচিত।
তিনি এই বুদ্ধিটা নেটওয়ার্কের গঠনেই বসিয়ে দিলেন। একই ছোট্ট প্যাটার্ন-খোঁজা চোখ পুরো ছবির উপর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চালানো। এর নাম হলো “কনভোলিউশনাল নিউরাল নেটওয়ার্ক”, সংক্ষেপে CNN। এই নকশা ছবির কাজে এত ভালো খাটতো যে পরের বহু বছর যন্ত্রের দেখা-শোনার (কম্পিউটার ভিশন) মেরুদণ্ড হয়ে থাকবে এটাই।
লেকুন তার নেটওয়ার্ককে ব্যাকপ্রপ দিয়ে শেখালেন হাতে লেখা সংখ্যা চিনতে। আর এটা এত ভালো কাজ করলো যে বাস্তবে ব্যবহার শুরু হলো। নব্বইয়ের দশকে আমেরিকার ব্যাংকগুলোতে চেকের উপর হাতে লেখা অঙ্ক পড়ার কাজে লেকুনের নেটওয়ার্ক ব্যবহার হতো। এক পর্যায়ে দেশের একটা উল্লেখযোগ্য অংশের ব্যাংক-চেক এই যন্ত্রের চোখ দিয়েই পড়া হতো।
ভেবে দেখুন। শীতের একেবারে মাঝখানে, যখন AI শব্দটাই লজ্জার, তখন একটা নিউরাল নেটওয়ার্ক নিঃশব্দে বাস্তব দুনিয়ায় আসল কাজ করছে, ব্যাংকে ব্যাংকে।
তাহলে এটাই তো বিপ্লব হওয়ার কথা ছিল, তখনই। কিন্তু হলো না। কেন?
কারণ দুটো, আর এই দুটোই আধুনিক AI-এর আসল রহস্য বুঝিয়ে দেয়।
এক, ডেটা। একটা নিউরাল নেটওয়ার্ক নিয়ম দিয়ে শেখে না, উদাহরণ দিয়ে শেখে। আর ভালোভাবে শিখতে তার লাগে অসংখ্য উদাহরণ, লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি। নব্বইয়ের দশকে অত ডেটা কোথায়? হাতে লেখা সংখ্যার একটা ছোট সংগ্রহ জোগাড় করা যায়, কিন্তু “পৃথিবীর সব জিনিসের ছবি”? সেই ভাণ্ডার তখনো তৈরিই হয়নি।
দুই, কম্পিউটারের শক্তি। এত বড় নেটওয়ার্ককে কোটি কোটি উদাহরণ দিয়ে শেখাতে যে বিপুল হিসাব লাগে, নব্বইয়ের দশকের কম্পিউটারের সেই ক্ষমতা ছিল না। ছোট নেটওয়ার্ক ছোট কাজে চলতো, কিন্তু বড় স্বপ্নের জন্য যন্ত্রটাই যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল না।
মানে চাবি তৈরি, দরজাও চেনা, কিন্তু দরজা খোলার মত জোর হাতে নেই। কানেকশনিস্টদের আইডিয়া ঠিক ছিল, শুধু তারা জন্মেছিলেন ভুল সময়ে, দুনিয়া তখনো তাদের জন্য তৈরি ছিল না।
আর তাই, দুর্দান্ত একটা আবিষ্কার হাতে নিয়েও, তাদের ঢুকতে হলো এক দীর্ঘ নির্বাসনে।
নির্বাসনের বছরগুলো
নব্বইয়ের দশকের মাঝ থেকে দুই হাজারের দশকের মাঝ পর্যন্ত, নিউরাল নেটওয়ার্ক ছিল বিজ্ঞানের দুনিয়ায় প্রায় অস্পৃশ্য।
কারণটা শুধু আবেগের না, ফলাফলেরও। ওই সময়টায় অন্য কিছু গাণিতিক পদ্ধতি, বিশেষ করে “সাপোর্ট ভেক্টর মেশিন” নামের একটা কৌশল, বাস্তবের অনেক কাজে নিউরাল নেটওয়ার্কের চেয়ে ভালো ফল দিচ্ছিল, আর সেগুলোর পেছনে ছিল পরিষ্কার, সুন্দর গণিত। তুলনায় নিউরাল নেটওয়ার্ককে মনে হতো এলোমেলো, খামখেয়ালি, “কেন কাজ করে বোঝা যায় না” গোছের একটা জিনিস।
এই সময়ের একটা গল্প এখন প্রায় কিংবদন্তি। গবেষকরা বলেন, বড় সম্মেলনে গবেষণা জমা দেওয়ার সময় তারা শিরোনামে “নিউরাল নেটওয়ার্ক” কথাটা লিখতেই ভয় পেতেন, কারণ ওই শব্দ দেখলেই বিচারকরা কাজটা বাতিল করে দিতেন। তাই তারা ঘুরিয়ে অন্য নাম ব্যবহার করতেন। ঠিক যেমন প্রথম শীতে গবেষকরা “AI” শব্দটা এড়িয়ে যেতেন, এখন কানেকশনিস্টরা এড়াতেন “নিউরাল নেটওয়ার্ক” শব্দটা।
এই নির্বাসনের বছরগুলোতেই অল্প কয়েকজন মানুষ আগুনটা জ্বালিয়ে রাখলেন। জেফ্রি হিন্টন, কানাডার টরন্টোতে। ইয়ান লেকুন, নিউ ইয়র্কে। আর ইয়োশুয়া বেঙ্গিও, মন্ট্রিয়লে। এই তিনজন, আর তাদের ছাত্র আর সহকর্মীদের ছোট্ট একটা দল, দুনিয়ার তাচ্ছিল্য গায়ে না মেখে কাজ করে যেতে থাকলেন। কানাডার একটা গবেষণা সংস্থা এই কঠিন সময়ে তাদের কিছুটা অর্থ জুগিয়েছিল, যেটা এই আগুনটা নিভতে দেয়নি।
তারা কেন হাল ছাড়েননি? কারণ তাদের একটা গভীর বিশ্বাস ছিল, যেটা যুক্তির যুগের বিশ্বাসের ঠিক উল্টো। তারা মানতেন, বুদ্ধি হাতে করে নিয়ম বসিয়ে বানানো যায় না, বুদ্ধি ফুটে ওঠে শেখার ভেতর দিয়ে, অভিজ্ঞতা থেকে। মস্তিষ্ক তো তা-ই করে। তাদের ধারণা ছিল, তাদের পদ্ধতি ছোট কাজে দুর্বল দেখাচ্ছে শুধু একটা কারণে, ডেটা আর কম্পিউটারের শক্তি কম। এই দুটো যেদিন আসবে, সেদিন সব বদলে যাবে।
তারা মূলত একটা বাজি ধরে বসে ছিলেন। বাজিটা ছিল ভবিষ্যতের উপর।
আর ঠিক সেই ভবিষ্যৎটাই আসছিল, দুই দিক থেকে একসাথে। একদিকে ইন্টারনেট মানুষের হাতে তুলে দিচ্ছিল আগে-কখনো-না-দেখা পরিমাণ ডেটা, কোটি কোটি ছবি, লেখা, ভিডিও। আরেকদিকে, আশ্চর্য এক কাকতালীয় ঘটনায়, ভিডিও গেম খেলার জন্য বানানো একধরনের বিশেষ চিপ হঠাৎ প্রমাণ করে দিলো, নিউরাল নেটওয়ার্ক শেখানোর কাজে সেগুলো অবিশ্বাস্য রকমের দ্রুত।
ডেটা আসছে। শক্তি আসছে। বাজিটা জেতার সময় হয়ে এসেছে।
তিরিশ বছরের নির্বাসন শেষ হতে চলেছে। পরের অংশে, ২০১২ সালের এক শরতে, একটা প্রতিযোগিতায়, এই নীরব বিপ্লবটা হঠাৎ বিস্ফোরিত হবে, আর গোটা দুনিয়া রাতারাতি টের পাবে, একটা নতুন যুগ শুরু হয়ে গেছে।
তিনটা নদীর মোহনা
কেন ঠিক ২০১২ সালের দিকেই সব বদলালো, আগে না, পরে না? উত্তরটা একটা কথায়: তিনটা আলাদা জিনিস, তিন দশক ধরে আলাদাভাবে বড় হয়ে, ঠিক এই সময়ে এসে একসাথে মিললো। ব্যাকপ্রপ আবিষ্কারের সময় এদের একটাও যথেষ্ট পরিণত ছিল না।
প্রথম উপকরণ, ডেটা।
মনে আছে অংশ ৪-এ বলেছিলাম, নিউরাল নেটওয়ার্ক নিয়ম দিয়ে শেখে না, উদাহরণ দিয়ে শেখে, আর ভালো শিখতে তার লাগে পাহাড়প্রমাণ উদাহরণ? দুই হাজারের দশকে ইন্টারনেট সেই পাহাড়টা বানিয়ে দিলো। কোটি কোটি মানুষ ছবি তুলছে, লেখা লিখছে, ভিডিও তুলছে, সব জমা হচ্ছে অনলাইনে। মানবজাতির ইতিহাসে প্রথমবার, যন্ত্রকে দেখানোর মত এত উদাহরণ হাতের নাগালে এলো।
এখানে একজন মানুষের কথা বিশেষভাবে বলতে হয়, ফেই-ফেই লি। তিনি একটা সহজ কিন্তু বৈপ্লবিক কথা বুঝেছিলেন। সবাই তখন ভালো অ্যালগরিদম বানানো নিয়ে ব্যস্ত, কিন্তু লি বললেন, আসল সমস্যা হয়তো অ্যালগরিদমে না, ডেটায়। যন্ত্রকে যদি ভালো করে দেখতে শেখাতে হয়, তাহলে তাকে বিশাল, সাজানো, নাম-লাগানো ছবির ভাণ্ডার দিতে হবে। তিনি আর তার দল বছরের পর বছর খেটে বানালেন “ইমেজনেট”, লক্ষ লক্ষ ছবির এক বিশাল সংগ্রহ, প্রতিটা ছবিতে লেখা সেটায় কী আছে। তারপর তারা একটা বার্ষিক প্রতিযোগিতা চালু করলেন: দেখা যাক, কোন প্রোগ্রাম এই ছবিগুলো সবচেয়ে ভালো চিনতে পারে।
দ্বিতীয় উপকরণ, কম্পিউটারের শক্তি, আর এটা এলো এক অদ্ভুত জায়গা থেকে, ভিডিও গেম থেকে।
ভিডিও গেমের ঝলমলে গ্রাফিক্স আঁকতে একধরনের বিশেষ চিপ লাগে, নাম GPU (গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট)। এই চিপের বিশেষত্ব হলো, এটা একসাথে হাজার হাজার সহজ হিসাব সমান্তরালে করতে পারে। কেউ কেউ খেয়াল করলেন, নিউরাল নেটওয়ার্ক শেখানোর কাজটাও আসলে ঠিক তা-ই, অজস্র সরল হিসাব, একসাথে, বারবার। মানে গেমারদের জন্য বানানো চিপটা, নিতান্ত কাকতালীয়ভাবে, নিউরাল নেটওয়ার্ক শেখানোর জন্য প্রায় আদর্শ যন্ত্র। এটা দিয়ে যে কাজ আগে কয়েক মাস লাগতো, সেটা নেমে এলো কয়েক দিনে।
তৃতীয় উপকরণ, অ্যালগরিদম, সেটা তো আগে থেকেই তৈরি ছিল। ব্যাকপ্রপ, কনভোলিউশনাল নেটওয়ার্ক, অংশ ৪-এ যা দেখলাম। এগুলো নতুন কিছু না, তিরিশ বছরের পুরনো।
মানে বিপ্লবটা ঘটানোর জন্য নতুন কোনো জাদুকরি আইডিয়া লাগেনি। পুরনো আইডিয়াটাই যথেষ্ট ছিল, শুধু তার সাথে দুটো জিনিস মিলতে হয়েছিল, যথেষ্ট ডেটা আর যথেষ্ট শক্তি। তিনটা নদী, অবশেষে, এক মোহনায় এসে মিললো।
আর সেই মোহনায় দাঁড়িয়ে, ২০১২ সালের এক শরতে, ফেই-ফেই লি-র সেই ছবি চেনার প্রতিযোগিতায়, একটা বিস্ফোরণ ঘটলো।
যে শরৎ সব বদলে দিলো
২০১২ সালের ইমেজনেট প্রতিযোগিতায় একটা দল একটা নিউরাল নেটওয়ার্ক নিয়ে হাজির হলো। দলটা টরন্টো থেকে, জেফ্রি হিন্টনের ছাত্র অ্যালেক্স ক্রিজেভস্কি আর ইলিয়া সুটস্কেভার, হিন্টনের সাথে। তাদের নেটওয়ার্কটার নাম পরে হয়ে গেল “অ্যালেক্সনেট”।
ফলাফলটা এমন ছিল যে প্রতিযোগিতার আয়োজকরা প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি।
ছবি চেনার এই প্রতিযোগিতায় প্রতিটা প্রোগ্রামকে মাপা হতো তার ভুলের হারে, কতবার সে ছবিটা ভুল চিনলো। আগের বছরগুলোতে সেরা প্রোগ্রামগুলো একটু একটু করে উন্নতি করছিল, প্রতি বছর হয়তো এক-দুই শতাংশ। প্রতিযোগীরা সবাই সেই পুরনো ঘরানার, হাতে করে বানানো ছবি-বিশ্লেষণের কৌশল ব্যবহার করতো।
অ্যালেক্সনেট এসে ভুলের হার এক ধাক্কায় প্রায় দশ শতাংশ কমিয়ে দিলো। এটা ছিল অকল্পনীয়, এক বছরে এতটা লাফ কেউ কখনো দেখেনি। দ্বিতীয় স্থানের প্রোগ্রামটা অ্যালেক্সনেটের ধারেকাছেও ছিল না।
এটা শুধু একটা প্রতিযোগিতা জেতা ছিল না। এটা ছিল একটা ঘোষণা।
কারণ অ্যালেক্সনেট সেই পুরনো, তাচ্ছিল্য-করা কানেকশনিস্ট পথেই বানানো, একটা গভীর নিউরাল নেটওয়ার্ক, ব্যাকপ্রপ দিয়ে শেখানো, GPU-তে চালানো, ইমেজনেটের বিশাল ডেটায় প্রশিক্ষিত। অংশ ৪-এর সেই নির্বাসিত আইডিয়াটা, তিন দশক পরে, হঠাৎ প্রমাণ করে দিলো, ঠিকঠাক উপকরণ পেলে সে বাকি সবাইকে বিশাল ব্যবধানে পেছনে ফেলে দেয়।
এই একটা ফলাফল গোটা ক্ষেত্রটাকে রাতারাতি ঘুরিয়ে দিলো। যে গবেষকরা এতদিন “নিউরাল নেটওয়ার্ক” শব্দটা শুনলে মুখ ফেরাতেন, তারা প্রায় সবাই কয়েক মাসের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এই পথে। ছবি চেনার ক্ষেত্রে যে ঘরানার কৌশল দশক দশক ধরে চলছিল, সেগুলো এক বছরের মধ্যে প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে গেল।
এই গোটা ধারাটার একটা নাম দাঁড়িয়ে গেল, “ডিপ লার্নিং”, বা গভীর শিক্ষা। “গভীর” কথাটা এসেছে নেটওয়ার্কের অনেকগুলো স্তর থাকা থেকে, একটার পর একটা লুকানো স্তর, যত গভীর তত জটিল প্যাটার্ন সে ধরতে পারে।
এখন একটা কথা থামিয়ে বলা দরকার, কারণ এটা এই সিরিজের একটা কেন্দ্রীয় সুর। এই বিপ্লবটা কোনো নতুন তত্ত্বের বিপ্লব ছিল না। যে অঙ্ক দিয়ে অ্যালেক্সনেট জিতলো, তার প্রায় সবটাই আশির দশকে জানা ছিল। বদলেছিল শুধু দুনিয়া, ডেটা আর শক্তি। এটা আমাদের একটা গভীর শিক্ষা দেয়: AI-এর ইতিহাসে বহুবার সবচেয়ে বড় লাফটা এসেছে চতুর নতুন আইডিয়া থেকে না, বরং পুরনো একটা সরল আইডিয়াকে বিশাল স্কেলে চালানো থেকে। এই শিক্ষাটা মনে রাখুন, শেষ অংশে এটাই হবে গোটা গল্পের মোড় ঘোরানো সত্য।
শরৎ শেষ হওয়ার আগেই, একটা নতুন যুগ শুরু হয়ে গেছে।
সোনার খনি
অ্যালেক্সনেটের পর যা ঘটলো, তাকে সোনার খনিতে হুড়োহুড়ি ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।
ছবি চেনা তো শুরু মাত্র। দেখা গেল, একই ডিপ লার্নিং পদ্ধতি প্রায় সব জায়গায় কাজ করে, যেখানেই যথেষ্ট ডেটা আছে।
কণ্ঠস্বর চেনা, যেটা কম্পিউটারের কাছে দশকের পর দশক ধরে এক দুঃস্বপ্ন ছিল, হঠাৎ কাজ করতে শুরু করলো। এই সময়েই ফোনে কথা বলে নির্দেশ দেওয়া, ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট, এসব বাস্তবে ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠলো। এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় অনুবাদ, যেটা আগে ছিল হাস্যকর রকমের বাজে, ডিপ লার্নিং এসে সেটাকে হঠাৎ অনেক মসৃণ করে দিলো। ফোনে ছবি তুললে সেটা নিজে থেকে মুখ চিনছে, বস্তু চিনছে।
যন্ত্র, প্রথমবারের মত, সত্যিকার অর্থে দেখতে আর শুনতে শিখলো।
ব্যবসার দুনিয়া এবার আর দূরে দাঁড়িয়ে রইলো না। বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বুঝে ফেললো, এটাই ভবিষ্যৎ। তারা ঝাঁপিয়ে পড়লো ডিপ লার্নিং গবেষকদের লুফে নিতে, প্রায়ই আস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার তুলে নিয়ে গিয়ে। যে হিন্টন, লেকুন, বেঙ্গিওদের একসময় কেউ পাত্তা দিতো না, তারা রাতারাতি হয়ে উঠলেন দুনিয়ার সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন বিজ্ঞানী।
এই স্বীকৃতির চূড়ান্ত রূপটা এলো ২০১৮ সালে, যখন হিন্টন, লেকুন আর বেঙ্গিও, এই তিনজন একসাথে পেলেন টুরিং পুরস্কার, কম্পিউটার বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ সম্মান, যাকে বলা হয় এই ক্ষেত্রের নোবেল। খেয়াল করুন নামটা, টুরিং পুরস্কার। অংশ ১-এর সেই অ্যালান টুরিং, যিনি ১৯৫০ সালে প্রথম প্রশ্নটা তুলেছিলেন, “যন্ত্র কি চিন্তা করতে পারে”, তার নামেই দেওয়া পুরস্কার উঠলো সেই তিনজনের হাতে, যারা যন্ত্রকে সবচেয়ে কাছে নিয়ে গেলেন সেই প্রশ্নের উত্তরের দিকে। গল্পটা যেন নিজের ভেতরেই একটা বৃত্ত পূরণ করছিল।
যে আইডিয়াটাকে দুইবার প্রায় কবর দেওয়া হয়েছিল, Perceptrons বইয়ে একবার, আর নব্বইয়ের নির্বাসনে আরেকবার, সেটাই এখন গোটা প্রযুক্তি-দুনিয়ার কেন্দ্রে।
কিন্তু এই পুরো সময়টায় যন্ত্র যা করছিল, তা মূলত “চেনা”, ছবি চেনা, শব্দ চেনা, প্যাটার্ন চেনা। একটা বড় প্রশ্ন তখনো ঝুলে ছিল: যন্ত্র কি শুধু চিনতেই পারে, নাকি সে সত্যিকারের কৌশল খাটাতে পারে, পরিকল্পনা করতে পারে, এমনকি এমন কিছু ভাবতে পারে যা কোনো মানুষ শেখায়নি?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ডিপ লার্নিং এমন একটা কাজ করে দেখালো, যেটা বহু বিশেষজ্ঞ ভেবেছিলেন তাদের জীবদ্দশায় সম্ভব হবে না।
মানুষের মত নয়, তার চেয়েও অচেনা
খেলাটার নাম গো। পূর্ব এশিয়ার এক প্রাচীন বোর্ড গেম, বয়স আড়াই হাজার বছরেরও বেশি। বোর্ডে সাদা-কালো পাথর বসানোর সহজ নিয়ম, কিন্তু ভেতরে এমন গভীরতা যে একে বলা হয় মানুষের বানানো সবচেয়ে জটিল খেলা।
গো কম্পিউটারের জন্য একটা বিশেষ দুঃস্বপ্ন ছিল। দাবায় প্রতি চালে সম্ভাবনা হয়তো ৩৫টা, কিন্তু গো-তে প্রতি চালে সম্ভাবনা প্রায় ২৫০টা। মনে আছে অংশ ২-এর সেই সাংযোজনিক বিস্ফোরণ? গো বোর্ডে সম্ভাব্য অবস্থার সংখ্যা মহাবিশ্বের সব পরমাণুর চেয়েও বেশি। তাই সব চাল হিসাব করে দেখার পুরনো কৌশল এখানে সম্পূর্ণ অকেজো। ভালো গো খেলোয়াড়রা বলেন, তারা অনেক সময় হিসাব করে না, বরং “অনুভব” করে কোন চালটা সুন্দর। এই স্বজ্ঞা, এই intuition, যন্ত্রে বসানো অসম্ভব বলেই ধরে নেওয়া হতো।
১৯৯৭ সালে একটা কম্পিউটার দাবায় বিশ্বসেরা মানুষকে হারিয়েছিল, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলতেন, গো-তে যন্ত্র মানুষকে হারাতে আরও অন্তত দশ-বিশ বছর লাগবে, যদি আদৌ কখনো পারে।
তারপর এলো ২০১৬ সালের মার্চ। DeepMind নামের একটা প্রতিষ্ঠানের বানানো প্রোগ্রাম, নাম আলফাগো, মুখোমুখি হলো দুনিয়ার অন্যতম সেরা গো খেলোয়াড় লি সেদোলের।
আলফাগো বানানো হয়েছিল ডিপ লার্নিং আর একটা পুরনো ধারণা মিলিয়ে, যেটার কথা আমরা অংশ ২-এ ছুঁয়ে গিয়েছিলাম, নিজে খেলে খেলে শেখা (মনে আছে আর্থার স্যামুয়েলের সেই চেকার্স প্রোগ্রাম?)। আলফাগো লক্ষ লক্ষ গেম খেলেছিল, মানুষের খেলা দেখে, আর নিজের বিরুদ্ধে নিজে খেলে, প্রতিবার একটু একটু করে ভালো হয়ে।
আলফাগো লি সেদোলকে হারালো, পাঁচ ম্যাচের সিরিজে চার-এক ব্যবধানে। কিন্তু ইতিহাস মনে রাখলো একটা নির্দিষ্ট চাল। দ্বিতীয় ম্যাচে, সাঁইত্রিশ নম্বর চালে, আলফাগো এমন একটা জায়গায় পাথর বসালো, যেটা দেখে ধারাভাষ্যকাররা প্রথমে ভাবলেন এটা নিশ্চয়ই ভুল, কোনো মানুষ পেশাদার এই চাল দিতো না। লি সেদোল নিজে চালটা দেখে হতভম্ব হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন কিছুক্ষণের জন্য।
কিন্তু চালটা ভুল ছিল না। খেলা যত এগোলো, বোঝা গেল সেটা ছিল এক অসামান্য, গভীর চাল, এমন একটা চাল যা আড়াই হাজার বছরের মানুষের গো-জ্ঞান কখনো ভাবেনি।
এই মুহূর্তটা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, সেটা একটু ভাবুন। যন্ত্রটা শুধু মানুষকে হারায়নি। সে মানুষকে শেখালো, একটা খেলায় যেটা মানুষ আড়াই হাজার বছর ধরে খেলছে। সে এমন কিছু “ভাবলো”, যা তাকে কেউ শেখায়নি, যা কোনো মানুষ আগে ভাবেনি।
মনে আছে অংশ ১-এ টুরিংয়ের সেই “লেডি লাভলেসের আপত্তি”-র জবাব? যন্ত্র কি আমাদের অবাক করতে পারে? টুরিং বলেছিলেন, প্রায়ই পারে। সাঁইত্রিশ নম্বর চাল ছিল সেই কথার সবচেয়ে সুন্দর প্রমাণ। ষাট বছর আগেকার একটা ভবিষ্যদ্বাণী, একটা গো বোর্ডে, সত্যি হয়ে গেল।
এতক্ষণে যন্ত্র দেখতে শিখেছে, শুনতে শিখেছে, এমনকি অচেনা কৌশল ভাবতে শিখেছে। শুধু একটা জিনিস তখনো বাকি, সেই জিনিসটা যেটা টুরিংয়ের ইমিটেশন গেমের একেবারে কেন্দ্রে ছিল, ভাষা। মানুষের মত করে কথা বলা, লেখা, বোঝা।
আর সেই শেষ দুর্গটা জয় করতে গিয়েই আসবে এই গোটা গল্পের শেষ, আর সবচেয়ে বড়, মোড়। সেই গল্প শেষ অংশে।
অর্থের জ্যামিতি
ভাষা যন্ত্রের কাছে কেন এত কঠিন ছিল, সেটা আগে বোঝা দরকার।
একটা ছবির পিক্সেল, একটা শব্দের তরঙ্গ, এগুলো সংখ্যা, আর যন্ত্র সংখ্যা নিয়েই কাজ করে। কিন্তু “ভালোবাসা” শব্দটা কী সংখ্যা? “যদিও” শব্দটা? ভাষার অর্থ তো সংখ্যায় লেখা নেই। তার উপর, শব্দের মানে নির্ভর করে চারপাশের শব্দের উপর। “কল” মানে কী, সেটা নির্ভর করে বাক্যের বাকিটার উপর, ফোন কল, নাকি পানির কল, নাকি ডেকে ওঠা।
প্রথম বড় অগ্রগতিটা এলো একটা সুন্দর ধারণা থেকে: শব্দকে সংখ্যায় বদলাও, কিন্তু এমনভাবে যাতে কাছাকাছি অর্থের শব্দ কাছাকাছি সংখ্যা পায়।
কল্পনা করুন একটা বিশাল বহুমাত্রিক মানচিত্র, যেখানে প্রতিটা শব্দ একটা বিন্দু। এই মানচিত্রে “রাজা” আর “রানি” পাশাপাশি, “কুকুর” আর “বিড়াল” কাছাকাছি, আর “রাজা” থেকে “টেবিল” অনেক দূরে। শব্দের অর্থ এখানে হয়ে দাঁড়ায় জ্যামিতি, অবস্থান আর দূরত্ব।
২০১৩ সালের দিকে এরকম শব্দ-মানচিত্র বানানোর একটা কৌশল (যার একটা বিখ্যাত রূপের নাম word2vec) দেখিয়ে দিলো কী অদ্ভুত জিনিস এখান থেকে বেরোয়। দেখা গেল, এই মানচিত্রে অর্থের সম্পর্কগুলো রীতিমত অঙ্কের মত খাটে। “রাজা” থেকে “পুরুষ” বিয়োগ করে “নারী” যোগ করলে আপনি পৌঁছে যান প্রায় “রানি”-র কাছে। যন্ত্র কাউকে ব্যাকরণ শেখায়নি, শুধু কোটি কোটি বাক্য পড়ে সে নিজে থেকে অর্থের এই জ্যামিতিটা বুঝে নিয়েছে।
এটা একটা বিশাল পদক্ষেপ ছিল। কিন্তু একটা বড় সমস্যা রয়ে গেল, ক্রম।
ভাষা তো শুধু শব্দের ঝুড়ি না, ভাষা হলো শব্দের ক্রম। “কুকুর মানুষকে কামড়ালো” আর “মানুষ কুকুরকে কামড়ালো”, শব্দ একই, মানে পুরো আলাদা। যন্ত্রকে বাক্য বুঝতে হলে শব্দের ক্রম আর তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ধরতে হবে।
এই ক্রম সামলানোর জন্য তখন যে নেটওয়ার্ক ব্যবহার হতো, সেগুলো বাক্যটা পড়তো একটা একটা শব্দ করে, বাঁ থেকে ডানে, আগের শব্দের স্মৃতি মাথায় রেখে। কিন্তু এর দুটো বড় সমস্যা। এক, লম্বা বাক্যে শুরুর দিকের কথা যন্ত্র ভুলে যেতো, বাক্যের শেষে পৌঁছাতে পৌঁছাতে শুরুর সুতোটা আলগা হয়ে যেতো। দুই, একটা একটা করে শব্দ পড়তে হতো বলে কাজটা ধীর, একে বড় স্কেলে চালানো কঠিন।
এই দুই সমস্যা একসাথে সমাধান করতে গিয়ে, ২০১৭ সালে, একদল গবেষক এমন একটা নকশা বের করলেন, যেটা AI-এর গোটা দিক বদলে দেবে। আর তার নামটাই ছিল একটা সাহসী দাবি।
মনোযোগ
২০১৭ সালে গুগলের একদল গবেষক একটা পেপার প্রকাশ করলেন, যার শিরোনাম এখন কিংবদন্তি: Attention Is All You Need, “মনোযোগই যথেষ্ট”।
তারা একটা নতুন নকশা প্রস্তাব করলেন, নাম ট্রান্সফর্মার। আজকের প্রায় সব বড় AI, যেগুলোর সাথে আপনি কথা বলেন, সবই এই এক নকশার সন্তান। তাই এর মূল আইডিয়াটা একটু বোঝা দরকার, ভয় নেই, ভেতরের ভাবটা সহজ।
আগের নেটওয়ার্ক বাক্য পড়তো একটা একটা করে, ক্রমে। ট্রান্সফর্মার বললো, না, পুরো বাক্যটা একসাথে দেখো, আর প্রতিটা শব্দকে সিদ্ধান্ত নিতে দাও, বাক্যের অন্য কোন কোন শব্দের দিকে তার “মনোযোগ” দেওয়া উচিত।
একটা উদাহরণ। ধরুন বাক্যটা, “মেয়েটা নদী থেকে ব্যাঙটা তুলে আনলো কারণ সেটা আটকে ছিল।” এখন “সেটা” মানে কী, ব্যাঙ না নদী? আপনি সহজেই বোঝেন, ব্যাঙ। কীভাবে? আপনি অবচেতনে “সেটা” শব্দটাকে বাক্যের অন্য শব্দগুলোর সাথে মিলিয়ে দেখেন, আর “আটকে থাকা”-র সাথে “ব্যাঙ” বেশি মানানসই বলে বুঝে নেন।
ট্রান্সফর্মারের “মনোযোগ” ব্যাপারটা ঠিক এটাই করে, অঙ্ক দিয়ে। প্রতিটা শব্দ বাকি সব শব্দের দিকে তাকায়, ঠিক করে কার সাথে তার সম্পর্ক কতটা জোরালো, আর সেই অনুযায়ী নিজের অর্থ ঠিক করে নেয়। “সেটা” শব্দটা “ব্যাঙ”-এর দিকে বেশি মনোযোগ দেয়, “নদী”-র দিকে কম। এভাবে বাক্যের ভেতরের সব সম্পর্ক, এমনকি দূরের শব্দের সাথেও, একসাথে ধরা পড়ে।
এই এক আইডিয়া দুটো পুরনো সমস্যা একসাথে সমাধান করে দিলো। লম্বা বাক্যে শুরুর কথা ভুলে যাওয়ার সমস্যা নেই, কারণ প্রতিটা শব্দ সরাসরি বাকি সবার দিকে তাকাতে পারে, দূরত্ব যতই হোক। আর যেহেতু পুরো বাক্য একসাথে দেখা হয়, একটা একটা করে না, তাই এই কাজ GPU-তে বিশাল সমান্তরালে চালানো যায়, ভয়ংকর দ্রুত।
আর এই দ্বিতীয় সুবিধাটা, এই স্কেল করার ক্ষমতা, সেটাই হয়ে দাঁড়ালো আসল জাদু। কারণ এখন এমন এক নকশা হাতে এলো, যেটাকে যত বড় করা যায়, যত বেশি ডেটা খাওয়ানো যায়, তত ভালো হতে থাকে, বাধা ছাড়াই।
আর ঠিক এই বড় করার খেলায় নেমেই মানুষ এমন একটা জিনিস আবিষ্কার করলো, যেটা এই গোটা গল্পের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত মোড়।
তেতো শিক্ষা
ট্রান্সফর্মার হাতে পেয়ে গবেষকরা একটা সরল কাজ দিলো যন্ত্রকে: ইন্টারনেটের বিশাল লেখার সাগর থেকে পড়ো, আর শুধু একটা কাজ শেখো, পরের শব্দটা কী হবে তা আন্দাজ করো।
শুনতে বোকা বোকা লাগছে? “আকাশে মেঘ করেছে, একটু পরেই হয়তো…” এরপর কী আসবে? “বৃষ্টি”। এই খেলা, পরের শব্দের ভবিষ্যদ্বাণী, কোটি কোটি বাক্যে বারবার করানো হলো। এভাবেই তৈরি হলো “ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল”, ভাষার মডেল, যেগুলোর নাম আজ আপনি জানেন।
একটা প্রতিষ্ঠান, OpenAI, এই পথে একটা সিরিজ বানালো, নাম দিলো GPT। GPT-১, তারপর GPT-২, তারপর ২০২০ সালে GPT-৩। প্রতিবার তারা একই মূল কাজটা করলো, শুধু নেটওয়ার্কটাকে আগের চেয়ে বহুগুণ বড় করলো, আরও বেশি ডেটা খাওয়ালো, আরও বেশি কম্পিউটার-শক্তি ঢাললো।
আর তখনই সেই অদ্ভুত ব্যাপারটা ধরা পড়লো।
মডেলটাকে শুধু “পরের শব্দ আন্দাজ করা” শেখানো হয়েছিল। অথচ যথেষ্ট বড় হওয়ার পর সে এমন সব জিনিস করতে শুরু করলো, যা তাকে কেউ শেখায়নি। সে অনুবাদ করতে পারলো। অঙ্ক কষতে পারলো। কবিতা লিখতে পারলো। কোড লিখতে পারলো। যুক্তি সাজাতে পারলো। কেউ তাকে আলাদা করে এসব শেখায়নি। শুধু “পরের শব্দ” শেখাতে শেখাতে, একটা নির্দিষ্ট আকার পার হওয়ার পর, এই ক্ষমতাগুলো যেন নিজে থেকে “গজিয়ে” উঠলো।
এই ঘটনাটার একটা নাম হলো, “ইমার্জেন্স”, উদ্ভব। ছোট মডেলে যে ক্ষমতা একদম ছিল না, বড় মডেলে সেটা হঠাৎ ফুটে ওঠে, কেউ তার নকশা না করেই।
এবার অংশ ১-এ ফিরে যান এক মুহূর্তের জন্য। টুরিংয়ের সেই “লেডি লাভলেসের আপত্তি”-র জবাব, যন্ত্র আমাদের অবাক করতে পারে, কারণ একটা প্রোগ্রামের প্রতিটা নিয়মের সব পরিণতি প্রোগ্রামারও আগে থেকে দেখতে পান না। ১৯৫০ সালে লেখা সেই এক লাইন, সত্তর বছর পরে, এই ইমার্জেন্সের চেহারায় ভয়ংকরভাবে সত্যি হয়ে দাঁড়ালো। AI মডেলগুলো নিয়মিতই তাদের নিজেদের নির্মাতাদের অবাক করছে, এমন ক্ষমতা দেখাচ্ছে যা কেউ ইচ্ছে করে বসায়নি।
এখান থেকে একটা গভীর শিক্ষা বেরিয়ে এলো, যেটাকে এই ক্ষেত্রের একজন প্রবীণ গবেষক নাম দিয়েছিলেন “তেতো শিক্ষা”। শিক্ষাটা এই: AI-এর ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, মানুষের চতুর হাতে-বানানো নিয়ম আর কৌশল শেষমেশ হেরে যায় সেই সরল পদ্ধতির কাছে, যেটা শুধু বিশাল ডেটা আর বিশাল কম্পিউটিং-শক্তিকে কাজে লাগায়। শিক্ষাটা “তেতো”, কারণ এটা গবেষকদের অহংকারে ঘা দেয়, আমাদের বুদ্ধিদীপ্ত আইডিয়াগুলো নয়, বরং নিছক স্কেলই বারবার জিতে যায়।
মনে করে দেখুন অংশ ২-এর যুক্তির যুগ, মানুষ হাতে করে নিয়ম বসিয়ে বুদ্ধি বানাতে চেয়েছিল, আর ব্যর্থ হয়েছিল। আর এখানে, সত্তর বছর পরে, উল্টো দর্শনটা জিতে গেল, নিয়ম বসিও না, শুধু বিশাল স্কেলে শিখতে দাও। অংশ ১-এ যে দুই দর্শনের কথা বলেছিলাম, সেই দীর্ঘ লড়াইয়ের ফয়সালা যেন এখানেই হয়ে গেল।
এখন হাতে একটা যন্ত্র, যেটা ভাষা বোঝে, লেখে, যুক্তি সাজায়, আর নিজের নির্মাতাকেও চমকে দেয়। শুধু একটা কাজ বাকি, একে গবেষণাগার থেকে বের করে সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দেওয়া।
সেটা ঘটলো ২০২২ সালের এক নভেম্বরের দিনে। আর তারপর দুনিয়াটা আর আগের মত রইলো না।
আপনার পকেটে ছিয়াত্তর বছরের প্রশ্ন
৩০ নভেম্বর, ২০২২। OpenAI তাদের একটা ভাষা-মডেলের উপর একটা সহজ চ্যাট-জানালা বসিয়ে সেটা বিনামূল্যে সবার জন্য খুলে দিলো। নাম, ChatGPT।
তারা ভেবেছিল এটা একটা ছোটখাটো পরীক্ষা। যা ঘটলো, তা ইতিহাসে বিরল। মাত্র কয়েক দিনে লক্ষ লক্ষ, কয়েক মাসে কোটি কোটি মানুষ এটা ব্যবহার শুরু করলো। মানব-ইতিহাসে এত দ্রুত এত মানুষের কাছে পৌঁছানো কোনো প্রযুক্তি আগে দেখেনি।
প্রথমবারের মত, সাধারণ একজন মানুষ, কোনো কোড না জেনে, কোনো গবেষক না হয়ে, একটা যন্ত্রের সাথে সাধারণ ভাষায় কথা বলতে পারলো, আর যন্ত্রটা বুঝলো, উত্তর দিলো, লিখে দিলো, তর্ক করলো।
তারপরের বছরগুলো, ২০২৩ থেকে আজ, ২০২৬ পর্যন্ত, এই মডেলগুলো ঢুকে পড়লো জীবনের সব কোণে। এগুলো এখন কোড লেখে, চিঠি লেখে, ছবি আঁকে, রোগ নিয়ে আলাপ করে, পড়াশোনায় সাহায্য করে, ছবি আর কণ্ঠস্বর বোঝে। যে জিনিস দশ বছর আগেও বিজ্ঞানকল্পনা মনে হতো, সেটা এখন আপনার ফোনে, আপনার পকেটে, একটা অ্যাপের দূরত্বে।
এবার একটু পিছিয়ে গিয়ে গোটা নদীটা একবার দেখুন, উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত।
অংশ ১-এ নরবার্ট উইনার একটা কামানের হিসাব করতে গিয়ে ভেবেছিলেন, যন্ত্র আর প্রাণী হয়তো একই নিয়মে চলে। ম্যাককালোক আর সেই পলাতক কিশোর ওয়াল্টার পিটস অঙ্ক দিয়ে দেখিয়েছিলেন, নিউরন আসলে সুইচের মত, আর সুইচ দিয়ে যেকোনো চিন্তা বানানো সম্ভব, সেই ধারণা থেকেই আজকের নিউরাল নেটওয়ার্ক। টুরিং একটা প্রশ্ন তুলেছিলেন, “যন্ত্র কি চিন্তা করতে পারে”, আর একটা খেলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যদি কথা বলে যন্ত্রকে মানুষ থেকে আলাদা করা না যায়, তবে?
ছিয়াত্তর বছর পরে, আপনি ঠিক সেই খেলাটাই খেলছেন, প্রতিদিন। একটা চ্যাট-জানালায় টাইপ করছেন, ওপাশ থেকে উত্তর আসছে, আর অনেক সময় আপনি নিশ্চিত হতে পারছেন না ওপাশে মানুষ না যন্ত্র। টুরিংয়ের ইমিটেশন গেম আর কোনো তাত্ত্বিক ধাঁধা নয়, এটা এখন কোটি কোটি মানুষের রোজকার অভিজ্ঞতা।
কিন্তু খেয়াল করুন, মূল প্রশ্নটার উত্তর আমরা আজও দিতে পারিনি। যন্ত্র কি সত্যিই চিন্তা করছে, নাকি অংশ ২-এর সেই ইলাইজার মত শুধু বোঝার ভান করছে, নিখুঁতভাবে? মডেলটা যখন আপনাকে সান্ত্বনা দেয়, ওপাশে কি সত্যিই কিছু “অনুভব” করছে, নাকি আপনি নিজেই, সেই পুরনো ইলাইজা-এফেক্টের বশে, একটা যন্ত্রের ভেতর একটা মন কল্পনা করে নিচ্ছেন? জোসেফ ওয়াইজেনবাউমের ষাট বছরের পুরনো অস্বস্তিটা আজ আগের চেয়ে অনেক জোরে বাজে।
এই সিরিজের শুরুতে বলেছিলাম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দুইবার প্রায় মরে গিয়েও ফিরে এসেছে। এখন আমরা জানি সেই দুই শীতের গল্প, আর জানি কেন প্রতিবার সে ফিরে এসেছে, কারণ প্রতিবার অল্প কয়েকজন মানুষ, লোকচক্ষুর আড়ালে, একটা আইডিয়ায় বিশ্বাস রেখে হাল ছাড়েননি।
আর প্রশ্নটা? প্রশ্নটা ছিয়াত্তর বছর ধরে একই আছে। শুধু ওপাশের যন্ত্রটা বদলেছে। আজ সেটা আপনার হাতের মুঠোয়, আর আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক ভালো করে টুরিংয়ের সেই খেলাটা খেলছে।
উইনারের কামান থেকে আপনার পকেট পর্যন্ত, নদীটা এতটা পথ পেরিয়েছে। কিন্তু যে প্রশ্নটা দিয়ে সব শুরু হয়েছিল, যন্ত্রের কি সত্যিই একটা মন আছে, সেই প্রশ্নটা আজও, আপনার আর ওই ঝিকমিক করা পর্দাটার মাঝখানে, উত্তরের অপেক্ষায় বসে আছে।
∎ পড়ার জন্য ধন্যবাদ। বাকি লেখাগুলো এখানে.